বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে আইনজীবীদের স্বল্প সংখ্যক উপস্থিতি এখন আর পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে আইনজীবী প্রার্থীর সংখ্যা সামান্য বাড়লেও সংসদের চরিত্র, নির্বাচনব্যবস্থার অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া মিলিয়ে আইনজীবীদের জন্য জাতীয় রাজনীতির দরজা কার্যত ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
আইন প্রণয়নের জায়গায় সংসদ সদস্যরা স্থানীয় উন্নয়ন, নিয়োগ ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারে বেশি সময় ব্যয় করছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সংসদের পেশাগত গঠনে। আইনজীবীদের উপস্থিতি কমছে, বাড়ছে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য। সংসদের এই কাঠামোগত বিচ্যুতি শুধু পেশাগত ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং রাজনৈতিক সহিংসতা, স্থানীয় পর্যায়ে সন্ত্রাস ও প্রশাসনিক দুর্বলতাও তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদ যখন আইন প্রণয়নের মূল দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে উন্নয়ন ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আইনসভায় ব্যবসায়ী ও অর্থশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য বেড়েছে। ফলে আইন প্রণয়নে দক্ষ, পেশাগতভাবে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত আইনজীবীরা প্রতিযোগিতার বাইরে ছিটকে পড়ছেন।
আইনজীবীরা বলছেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের নির্বাচনী সংস্কৃতি, এলাকায় স্থায়ী রাজনৈতিক উপস্থিতি ও পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতির কারণে একজন পেশাদার আইনজীবীর পক্ষে নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সংসদের আইন প্রণয়ন সক্ষমতার ওপর। সংসদে আইন বোঝেন এমন প্রতিনিধির সংখ্যা কমে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই পাস হচ্ছে, যা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন তারা।
তাদের মতে, যদি সংসদকে কেবল আইন প্রণয়নের দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো এবং অন্য কোনো ধরনের উন্নয়ন বা প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ না থাকত, তাহলে সংসদের চরিত্রটাই বদলে যেত। সেক্ষেত্রে সংসদে আইনজীবীদের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ত। কারণ, আইন প্রণয়ন জ্ঞান, যুক্তি ও বিশ্লেষণনির্ভর কাজ। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ও চিন্তাশীল রাজনীতিবিদের উপস্থিতিও বাড়ত।
তখন শুধু বেনিফিট নেওয়ার জন্য কেউ এমপি হতে আসত না। কারণ, আইন প্রণয়ন সহজ কাজ নয়, এতে ব্যক্তিগত লাভের সুযোগও সীমিত। সংসদ সদস্য হওয়া তখন ক্ষমতা বা সুযোগ লুটের জায়গা না হয়ে, প্রকৃত অর্থেই রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দায়িত্বশীল ও নীতিনির্ধারণমূলক কঠিন কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো।
একাধিক নির্বাচন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আইনজীবী সংসদ সদস্য প্রার্থীর হার মাত্র ১১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যেখানে ব্যবসায়ীদের হার দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের অংশ ছিল প্রায় ৪৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
দশম নির্বাচনে ২০১৪ সালে তা বেড়ে হয় ৫৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের অংশ ছিল ৫১ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তা আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বিপরীতে একাদশ নির্বাচনে আইনজীবী প্রার্থীর হার ছিল ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং দ্বাদশ নির্বাচনে তা নেমে আসে ৯ দশমিক ৪০ শতাংশে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদকে আবার সংবিধান অনুযায়ী শুধুই আইন প্রণয়নের কেন্দ্রে ফিরিয়ে না আনলে এবং মনোনয়ন ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার না হলে, আইনজীবীদের সংসদে অর্থবহ উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী টাইমসকে বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যারা আর্থিকভাবে সক্ষম, তারাই সাধারণত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। স্বল্প আয়ের মানুষ বা অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বাস্তবে খুব সীমিত। তিনি বলেন, সংসদ যেখানে আইন সংস্কার ও নতুন আইন প্রণয়নের কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেখানে বিগত সংসদগুলোতে আমরা সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। তার ভাষায়, সংসদে সদস্যরা নিজ নিজ এলাকা নিয়ে কথা বলেন, যা মূলত স্থানীয় সরকারের এখতিয়ার।
সুব্রত চৌধুরীর মতে, সংসদ সদস্যরা আসলে বাংলাদেশের সমস্ত আইন-কানুন পর্যালোচনা, পরিবর্তন ও সংশোধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু সেই জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পরিবেশটা যদি আমরা পাই, তাহলে ভবিষ্যতে সংসদীয় রাজনীতির চর্চা সারা বছরব্যাপী করা সম্ভব। এজন্য তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে অধিক সংখ্যক আইনজীবী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার দাবি করেন এবং সুশীল সমাজের ভূমিকা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।’
সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ টাইমসকে বলেন, স্বাধীনতার পর সংসদে আইনজীবীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। কারণ স্পষ্ট ছিল, সংসদ মানেই আইন প্রণয়নের জায়গা। আইনজীবীরা আইন পড়েই আসেন। আইনের ব্যাপারে তাদের যে এক্সপার্টিজ, অন্যদের সে সুযোগ নেই। কিন্তু যখন সংসদকে আইন প্রণয়নের মূল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হলো, তখনই এই ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। তার ভাষায়, তখন আর আইনজীবীদের প্রয়োজন হলো না, ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন হলো।
মনজিল মোরসেদের মতে, ব্যবসায়ীরা সংসদে প্রবেশ করে আইন প্রণয়নকে এক ধরনের লাভের কাঠামোয় পরিণত করেছেন।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের মেইন পারপাস প্রফিট। তারা যখন আইন প্রণয়ন করবে, বক্তব্য দেবে; তখন মুনাফাই মাথায় থাকবে। এর ফল হিসেবে সংসদের ওপর জনগণের আস্থা কমেছে এবং নির্বাচন ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সবচেয়ে বড় সংস্কার হওয়া উচিত সংসদকে আবার শুধুমাত্র আইন প্রণয়নের জায়গায় ফিরিয়ে আনা। উন্নয়ন কাজের নামে এলাকায় এমপির হস্তক্ষেপ করা, স্কুল-কলেজে নাক গলানো, এসব বন্ধ না করতে পারলে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ টাইমসকে বলেন, আইনসভায় আইনজীবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা উচিত। কারণ, এটি আইন তৈরির প্রতিষ্ঠান। আইন প্রণয়ন জায়গায় একজন ব্যবসায়ীর আসলে কী করার আছে? ব্যবসায়ী সংসদে বসে নিজের ব্যবসা কীভাবে আরও লাভবান করা যায়, সেই চিন্তায় থাকে। কিন্তু তিনি জানেন না, আইন কীভাবে প্রণয়ন করতে হয়। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে আইনি ফাঁকফোকর থেকে যায়।
তিনি বলেন, জামিনযোগ্য মামলায় আসামিকে জামিনে মুক্ত রেখেই বিচার শেষ করা সম্ভব। বিচার শেষে প্রয়োজনে তাকে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে, তবে বিচার চলাকালে তাকে শুধু হাজিরা দিতে হবে। এতে করে কারাগারে আসামির সংখ্যা কমে যাবে, মামলার খরচও কমবে। এ ধরনের চিন্তা বা আইনি সমাধান অন্য পেশার কারও মাথায় সহজে আসবে না।
মহসিন রশিদ বলেন, আইনজীবীরা মাঠপর্যায়ের নাগরিক সমস্যার সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করেন, ফলে তারা বাস্তবসম্মত আইন প্রণয়নে বেশি সক্ষম। রাজনৈতিক দলগুলো আইনজীবীদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কোনো উদ্যোগ নেয় না।
এ কারণে তিনি মনে করেন, আইন করেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু এটি একটি আইনসভা, যার মূল কাজ আইন প্রণয়ন, সেহেতু কমপক্ষে ৩০ শতাংশ মনোনয়ন আইনজীবীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা উচিত। একই সঙ্গে এমপিদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থেকে পুরোপুরি দূরে রেখে শুধুমাত্র আইন প্রণয়নের কাজে সীমাবদ্ধ রাখার দাবি জানান তিনি।
সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান টাইমসকে বলেন, নির্বাচন এখন অবৈধ পয়সা নির্ভর হয়ে গেছে। তার ভাষায়, অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকের টাকা নেয়, শোধ করে না। কালো টাকার ব্যবহার হয়। আইনজীবীরা আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকার চেষ্টা করেন বলে এই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না। তিনি বলেন, দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতিতে আইনজীবীরা নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেন না।
বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব ও সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, আইনজীবীরা যখন নির্বাচনে দাঁড়ান, তখন অনেক ক্ষেত্রে মানুষ তাদের ভোট দিতে চায় না। কারণ, মানুষের একটি বড় অংশ চায় দুর্নীতির পথটা খোলা থাকুক, যেন তারা বিভিন্ন ধরনের অন্যায় সুবিধা নিতে পারে। কিন্তু একজন আইনজীবী অনৈতিকভাবে, ইচ্ছামতো মানুষ বা নেতাকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে না।
তিনি মনে করেন, দেশের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হয়। দেশকে গঠন করতে গেলে, দেশকে সঠিক পথ দেখাতে গেলে সময়োপযোগী নতুন নতুন আইন করতে হয়। যেহেতু আইনজীবীরা নিয়মিত আইন নিয়ে কাজ করেন, তাই এই বিষয়ে তাদের স্বাভাবিকভাবেই দক্ষতা থাকে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে আইনজীবীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। এই কারণেই সংসদে আইনজীবীদের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, এখন নানা ধরনের কালো আইন ও ইচ্ছামতো আইন পাস হচ্ছে। বর্তমানে যারা সংসদ সদস্য, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই আইন বোঝেন না। আমলারা যে খসড়া আইন তৈরি করে দেন, সংসদ সদস্যরা সেটাই টেবিল চাপড়ে পাস করে দেন। তারা কখনোই সেই আইন পড়েন না, দেখেন না, বিশ্লেষণও করেন না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, জুলাই বিপ্লবের পর সংসদকে প্রকৃত ভূমিকায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ ছিল। সবচেয়ে জরুরি সংস্কারটি হওয়া উচিত ছিল, সংসদকে একান্তভাবে আইন প্রণয়নের জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। অর্থাৎ সংসদ আইন প্রণয়ন করবে, কিন্তু কোনো ধরনের ডেভেলপমেন্ট বা বাস্তবায়নমূলক কাজে জড়িত থাকবে না। সংবিধানেও সংসদের ভূমিকা মূলত সেভাবেই নির্ধারিত।
কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই এই প্রশ্নটি সামনে আনেনি, এমনকি এটাকে বিশেষ গুরুত্বও দেয়নি। এর ফলেই সংসদের ওপর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব আজও রয়ে গেছে। এমপি হওয়া এখনো মূলত ক্ষমতা, প্রভাব এবং ব্যক্তিগত লাভের একটি মাধ্যম হিসেবেই রয়ে গেছে।


