মধুপুরের লাল মাটিতে সূর্যমুখীর হাসি

মধুপুরের লাল মাটিতে সূর্যমুখীর হাসি
বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাজারো সূর্যমুখী। শনিবার মধুপুর উপজেলার মহিষমারা ইউনিয়নের মহিষমারা গ্রামে | ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

আনারসের রাজধানী হিসেবে খ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুর এখন হলদে আভায় উজ্জ্বল। লাল মাটির এই জনপদে এবার প্রথাগত ফসলের বাইরে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করে কৃষিতে নতুন এক বিপ্লবের সূচনা করেছেন স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কৃষি উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেন। মধুপুরের পাহাড়ি গড়ের বুকে তার গড়ে তোলা এই বাগান শুধু যে প্রকৃতির শোভা বর্ধন করছে তা নয়, বরং ভোজ্য তেলের সংকট মেটাতে এবং কৃষকদের ভাগ্য বদলে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

মধুপুর উপজেলার মহিষমারা ইউনিয়নের মহিষমারা গ্রামে গেলেই দেখা মেলে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাজারো সূর্যমুখী। ভোরের মিষ্টি রোদে যখন এই ফুলগুলো ঝলমল করে ওঠে, তখন সেখানে ভিড় জমায় প্রজাপতি আর মৌমাছির দল। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন দূর–দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শিক্ষার্থী, পর্যটক এবং উৎসুক কৃষক।

ছানোয়ার হোসেনের এই উদ্যোগ কেবল একটি বাগান নয়, বরং এটি এখন একটি জীবন্ত পাঠশালায় পরিণত হয়েছে, যেখানে এসে অনেকেই শিখছেন নতুন দিনের চাষাবাদ পদ্ধতি।

কৃষি উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেন এর আগেও মধুপুরের মাটিতে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ, কাজু বাদাম, কফি, ড্রাগন ও মাল্টা চাষ করে সফলতার নজির স্থাপন করেছেন। এমনকি ঔষধি গুণসম্পন্ন ‘রোজেলা চা’ চাষেও তিনি দেখিয়েছেন মুনশিয়ানা। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২৪ সালে মর্যাদাপূর্ণ কৃষি স্বর্ণপদক লাভ করেন।

নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে ছানোয়ার হোসেন বলেন, এ বছর তিনি দুই বিঘা জমিতে বারি–৩ জাতের সূর্যমুখীর আবাদ করেছেন। ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় এতে পানি ও কীটনাশক খুবই কম লাগে এবং উৎপাদন খরচও সীমিত। অল্প সময়ে ফসল ঘরে তোলা যায় বলে এটি অত্যন্ত লাভজনক।

আরও পড়ুন

তিনি আরও জানান, খরা সহনশীল হওয়ায় মধুপুরের মাটি ও আবহাওয়া সূর্যমুখী গাছের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষিকে লাভজনক করতে হলে প্রথাগত ফসলের বাইরে এসে নতুন ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফসল চাষে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান এই উদ্যোক্তা।

উপজেলা কৃষি অফিসের পরিসংখ্যান বলছে, মধুপুরে সূর্যমুখী চাষের পরিধি দ্রুত বাড়ছে। গত বছর যেখানে ১৮ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল, সেখানে এ বছর ৪৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদন হয়েছে ২৫ হেক্টর জমিতে, যা গত বছরের তুলনায় ৬ হেক্টর বেশি।

মূলত, তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধির কারণেই কৃষকরা এই হাইব্রিড জাতের সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এই তেলে রয়েছে ওমেগা–৬ ও ওমেগা–৯ এর মতো উপকারী উপাদান। এটি ক্ষতিকারক ফ্যাটি এসিডমুক্ত, যা হার্টের রোগীদের জন্য নিরাপদ।

মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সহায়তায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা। মধুপুর উপজেলা উপসহকারী কৃষি অফিসার এরশাদ আলী জানান, সূর্যমুখী এমন একটি ফসল যাতে খরচ কম অথচ লাভ অনেক বেশি। ছানোয়ার হোসেনের সফলতা দেখে এলাকার অনেক কৃষকই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। আগামীতে মহিষমারা ইউনিয়নে সূর্যমুখীর আবাদ আরও ব্যাপক হারে বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন এরশাদ আলী।

মধুপুরের কৃষিতে এই নতুন ধারা নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রকিব আল রানা। তিনি বলেন, সূর্যমুখী একটি লাভজনক অর্থকরী ফসল। ছানোয়ার হোসেনের এই সাফল্য স্থানীয় কৃষিতে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

রকিব আল রানার মতে, যদি সূর্যমুখী চাষকে আরও সম্প্রসারণ করা যায়, তবে দেশের ভোজ্য তেলের আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে। কৃষকদের আয়ের পথ আরও সুগম হবে। ছানোয়ার হোসেনের হাত ধরে মধুপুরের লাল মাটিতে যে সোনালি বিপ্লব শুরু হয়েছে, তা এখন সমগ্র টাঙ্গাইলের কৃষকদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad