আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একের পর এক সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একটি দলের আপত্তির মুখে বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে তারা। বিশেষ করে বিএনপির আপত্তির মুখে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ‘ইউ-টার্ন’ নিয়েছে ইসি।
তবে ইসির দাবি, কোনো রাজনৈতিক চাপে নয়, বরং সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই এই ‘ইউ-টার্ন’ নেওয়া হয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে বিএনসিসি মোতায়েন
ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভোটারদের সহায়তার জন্য শুরুতে বিএনসিসি ক্যাডেটদের নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইসি। এজন্য স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল।
বিএনপির পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলা হয়, ভোটকেন্দ্রে এমন একটি সংগঠনের উপস্থিতি জনমনে বিভ্রান্তি ও বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে দেখা করে বিএনপি নেতারা তাদের আপত্তি জানিয়ে আসেন। এর দুই দিনের মধ্যে বিএনসিসি নিয়ে ইসি তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিএনসিসি সদস্যরা কেবল পোস্টাল ব্যালট গণনার কেন্দ্রে নিয়োজিত থাকবেন।
পোস্টাল ব্যালটের নকশা জটিলতা
প্রবাসী ভোটারদের জন্য শুরুতে বর্ণানুক্রমিক প্রতীকের অবস্থান ঠিক করে ডাকযোগে ভোটের ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি অভিযোগ তোলে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পোস্টাল ব্যালটের নকশা হয়েছে। এতে তাদের দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ ব্যালট পেপারের অনেক নিচে ভাঁজের মধ্যে চলে গেছে। অথচ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গী এনসিপির প্রতীক স্থান পেয়েছে সবার ওপরে।
এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকের পর ইসি পোস্টাল ব্যালটের নকশায় পরিবর্তন আনে। এই পরিবর্তনের ফলে অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ভোটপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় এবং অনেক ভোটার সময়মতো ব্যালট পাননি বলে জানা গেছে।
আচরণবিধিতে শেষ মুহূর্তের সংশোধন
ভোটগ্রহণের মাত্র সাত দিন আগে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ইসি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভোটার স্লিপের নির্দিষ্ট আকার (১২ সেমি x ৮ সেমি) বজায় রাখতে হবে। তবে এতে প্রার্থীর নাম ও প্রতীকের ওপর থাকা পূর্বের বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে।
এ ছাড়া, প্রচারের ক্ষেত্রে মাইক ব্যবহারের সীমাবদ্ধতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। আগে একটি নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ তিনটি মাইক ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও এখন প্রার্থীরা প্রয়োজন অনুযায়ী মাইক ব্যবহার করতে পারবেন। জানা গেছে, বিএনপির দাবির মুখেই এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নিয়ে নাটকীয়তা
রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও ইসি তার অবস্থানে অটল থাকতে পারেনি। শুরুতে কিছু দলকে নিবন্ধনের ঘোষণা দিয়েও পরে তা বাতিল করা হয়। আবার ‘আমজনতার দল’-এর নিবন্ধন না পাওয়ায় দলটির সদস্য সচিব তারেক রহমানের আমরণ অনশন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংহতির মুখে ইসি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত ‘আমজনতার দল’ ও ‘জনতার দল’ উভয়কেই নিবন্ধন দেওয়া হয়।
সীমানা নির্ধারণ ও তফসিল বিতর্ক
নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ ছিল এই কমিশনের জন্য সবথেকে বড় অগ্নিপরীক্ষা। ৪৬টি আসনের সীমানা পরিবর্তন নিয়ে উচ্চআদালতে ৩০টিরও বেশি রিট মামলা হয়। বাগেরহাট ও গাজীপুরের সংসদীয় আসন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে ইসি শেষ মুহূর্তে তাদের গেজেট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এমনকি পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত ও পুনরায় চালুর মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে।
এছাড়া মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময়সীমা নিয়েও ইসি তাদের নিজস্ব বিধিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংলাপ ও ইসির আত্মপক্ষ সমর্থন
নির্বাচনের আগে সংলাপে ডাকার ক্ষেত্রেও ইসি দ্বিমুখী আচরণ করেছে বলে অভিযোগ করছে দলগুলো। শুরুতে সব নিবন্ধিত দলকে ডাকার কথা থাকলেও পরে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের শরিকদের বাদ দিয়ে ৪৯টি দলের সঙ্গে সংলাপ করা হয়।
বারবার সিদ্ধান্ত বদলের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসুদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতেই এই পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে।’
তিনি দাবি করেন, কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে ইসি এসব করেনি। কমিশনের অভ্যন্তরে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর যৌক্তিক আপত্তির কারণে সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। ইসি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এবং জনস্বার্থেই কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন আবদুর রহমানেল মাসুদ।


