রাজনীতিতে নারীবিদ্বেষ: জামায়াত নেতার মন্তব্যে নিন্দার ঝড়

রাজনীতিতে নারীবিদ্বেষ: জামায়াত নেতার মন্তব্যে নিন্দার ঝড়
Advertisement
Advertisement

বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মো. শামীম আহসানের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্য নারীর মর্যাদা এবং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

বরগুনার এক জনসভায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে (ডাকসু) ‘পতিতালয়’ বলে অভিহিত করেন। তার ব্যবহৃত ভাষা কেবল অশ্লীলই ছিল না, বরং অনেকে মনে করেন এটি নারীর প্রতি প্রকাশ্য অপমান, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চরিত্রের ওপর আঘাত এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। এর ফলে চারদিকে তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। এই প্রতিক্রিয়াগুলো প্রমাণ করে যে, সমাজ এখন আর এমন ভাষা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের ঝড়

এই সামাজিক প্রত্যাখ্যানের শুরু এবং সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ডাকসুর নির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা এই মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘রাজনীতিতে নারীদের নিয়ে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার একটি চলমান সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এই ধারা বন্ধ না হলে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও কমে যাবে। এক সময় রাজনীতিতে নারী খুঁজে পাওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

হেমা চাকমা আরও বলেন, এই ধরনের মন্তব্য একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয়। এটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ‘খারাপ’ হিসেবে উপস্থাপন করে। তার মতে, এটি কেবল নারীদের লক্ষ্য করে বলা নয়, বরং উচ্চশিক্ষাকেই একটি ‘পাপ’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এটি নির্বাচনের সময় নারীদের বিরুদ্ধে চলমান রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।

একই বাস্তবতা তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সীমা আক্তার বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রচারণায় সচেতনভাবে নারীদের টার্গেট করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, নির্বাচনী রাজনীতি থেকে নারীদের সরিয়ে দিতে ‘চরিত্রহনন’কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদার ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে দুর্বল করতেই নারীদের ওপর এমন আক্রমণ করা হয়। উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়। কারণ, সমাজের একটি অংশকে সহজেই এটি দিয়ে প্রভাবিত করা যায়।

সীমা আক্তার আরও যোগ করেন, যারা নারী সম্মানের কথা বলেন, তারাই আবার ভিন্নমতের নারীদের প্রকাশ্যে অপমান করেন। ‘নারী কার্ড’ খেললেও নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় রাখা হয় না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে রাজনৈতিক দল নারীদের কোনো মনোনয়ন দেয় না, তারা ক্ষমতায় গিয়ে নারীদের অধিকার রক্ষার নৈতিক দাবি কীভাবে করে?

প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবাদ

আরও পড়ুন

শামীম আহসানের বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবাদও এসেছে। ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন। তিনি এই বক্তব্যকে ‘ঘৃণ্য ও মানহানিকর’ বলে অভিহিত করে শামীম আহসানকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুকে ‘মাদক ও পতিতার জায়গা’ বলা কেবল মিথ্যাই নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য চরম অবমাননাকর। যদি নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকে, তবে আইনি পথ আছে। কিন্তু পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে লক্ষ্য বানানো রাজনৈতিক দেউলিয়া ছাড়া আর কিছু নয়।

কেবল ডাকসু নয়, অন্যান্য সংগঠনও এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ এই মন্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন, অশ্লীল এবং নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের চরিত্রহনন সহ্য করা হবে না।

তারা আরও জানায়, যারা ইসলামের নাম নিয়ে নারীদের অপমান করে, তাদের ইসলামের নাম ব্যবহারের কোনো নৈতিক অধিকার নেই। এই বক্তব্য জামায়াতের ধর্মীয় ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বিক্ষোভ ও ক্ষমা প্রার্থনা

প্রতিবাদের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ করেন। সেখানে শামীম আহসানের কুশপুতুল দাহ ও মিছিল করা হয়। ডাকসু সদস্য, হল সংসদের নেতা এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতিতে এটি ছিল সম্মিলিত প্রতিবাদ।

এক পর্যায়ে সাংগঠনিক চাপে শামীম আহসান তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চান। তবে সমালোচকরা বলছেন, তার মধ্যে কোনো প্রকৃত অনুশোচনা ছিল না। যদি কেউ আদর্শিক ভুল বুঝতে পারে, তবে তার মধ্যে আন্তরিক অনুতাপ থাকা উচিত। ক্ষমা চাওয়ার পেছনে ‘দলীয় চাপের’ কথাটি প্রমাণ করে যে এটি কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি এমন এক সাংগঠনিক সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলে যেখানে এমন ভাষা প্রথমে গ্রহণযোগ্য মনে হয় এবং পরিস্থিতি খারাপ হলেই কেবল তা প্রত্যাহার করা হয়।

শিক্ষকদের অবস্থান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মনামী) এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের প্রকৃত অগ্রগতির বদলে নারীর মর্যাদাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি সরাসরি নারীদের আরও বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’

শামীম আহসানের মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘যখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে নারীর মর্যাদা রক্ষার কথা বলেন, তখন একজন নেতার এমন মানহানিকর বক্তব্য সেই অবস্থানের সম্পূর্ণ বিরোধী। একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে সংযম ও শালীনতা আশা করা হয়, কিন্তু এই বক্তব্য তার উল্টোটা দেখিয়েছে।’

অধিকারকর্মীদের উদ্বেগ

নারী অধিকার সংগঠন ‘উই ক্যান’-এর নির্বাহী সমন্বয়কারী জিনাত আরা হক বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো পুরুষ ভোটারদের খুশি করতে ইচ্ছাকৃতভাবে নারীবিদ্বেষকে কাজে লাগাচ্ছে। শিক্ষিত ও স্পষ্টভাষী নারীদের অবমাননাকর ভাষায় আক্রমণ করাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হয়েছে। এটি চলতে থাকলে নারীর সম্মান কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, রাজনৈতিক চর্চায় তার প্রতিফলন ঘটবে না।

সমাজের বিভিন্ন স্তরের এই জোরালো প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে, নারীবিদ্বেষী ভাষা এখন আর সাধারণ ‘মতপ্রকাশ’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট যে, সমস্যাটি কেবল একটি মন্তব্য বা একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন, যেখানে নারীকে অপমান করা ফায়দা লুটবার একটি স্বাভাবিক উপায়ে পরিণত হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad