বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে রক্ষা করবে কে?

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে রক্ষা করবে কে?
গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশে হামলা ও সহিংসতার পর শহরজুড়ে সেনা টহল। ছবি: অনিক রহমান/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তিন মামলায় পরোয়ানা জারি হওয়া সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার, আদালতে হাজির করাসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে সম্প্রতি বেশকিছু বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। বাংলাদেশের আইনি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার এসব মন্তব্য বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে আনছে। যা বিচারিক প্রক্রিয়া এবং প্রসিকিউটরের বক্তব্যের এখতিয়ার নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় সৃষ্টি করেছে।

এই সংশয় শুধুমাত্র তার বক্তব্যের ধরনের কারণে নয় বরং তার বক্তব্যের নিগূঢ় তাৎপর্য থেকেও সৃষ্টি হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই তা বিচার প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে; বিশেষত সেই বিচার প্রক্রিয়া যার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা।

চিফ প্রসিকিউটরের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরছে। আর সেটি হলো, তিনি কি নিজেকে বিচারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন? নাকি তিনি আদালতে সরকারের প্রতিনিধির ভূমিকায় কাজ করছেন?

আমাদের মনে রাখতে হবে, অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো প্রমাণ হয়নি। তারপরেও চিফ প্রসিকিউটর এমন সব মন্তব্য করছেন যাতে মনে হতে পারে যে দোষ প্রমাণ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি খেয়াল না রাখলে আইনি প্রক্রিয়ার অক্ষুণ্ণতা বিপন্ন হতে পারে।

বিচার ব্যবস্থার মৌলিক নীতি হলো, অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দোষ মনে করা। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত সাধারণ মানুষ নাকি সেনা কর্মকর্তা, সেটি বিবেচ্য হতে পারে না।

কিন্তু চিফ প্রসিকিউট তাজুল ইসলামের ভাষায় মনে হয়, মামলার রায় এরই মধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে। এটি বিচারনীতিতে ক্ষুণ্ণ করে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় তৈরি করতে পারে পক্ষপাতিত্ব।

এরই মধ্যে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার এবং সাবজেলে রাখার বিষয় নিয়ে জনমনে এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। যে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধ প্রমাণই হয়নি, তাদের গ্রেপ্তার করতে কেন পুলিশবাহিনীকে ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষই প্রশ্ন তুলছেন।

যেসব কর্মকর্তাকে সেনা সদর দপ্তরে ডাকা হয়েছে তাদের বেশিরভাগই সেই ডাকে স্বেচ্ছায় সাড়া দিয়েছেন। যা প্রমাণ করে, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

আরও পড়ুন

এরপরেও সেনাসদস্যদের গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশবাহিনী ব্যবহার করার দাবি আসলে বিভ্রান্তিকর। যা জনগণের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রতীক সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্বকেই ইঙ্গিত করে।

এ পর্যন্ত মেজর জেনারেল কবির আহমেদ ছাড়া আর কোনো কর্মকর্তা পালানোর চেষ্টা করেননি। যার অর্থ সেনাবাহিনীর সদস্য আইনের শাসনে বিশ্বাসী।

যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া এবং ন্যায়বিচার পাওয়া অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের অধিকার। কারণ আইন সবার জন্য সমান। বিচার প্রক্রিয়াকে হতে হয় নিরপেক্ষ, কারও পদ বা পদবি সেখানে বিবেচ্য হতে পারে না।

সেনা সদস্যদের বিচারের প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটরের বাড়তি উত্তেজনাকর বক্তব্য বরং বিচার প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা সম্পর্কে সন্দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

যদি বারবার তাকে এমন আবেগপ্রবণ এবং পূর্বানুমানমূলক মন্তব্য করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক সত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

চিফ প্রসিকিউটর, বিচারক এবং অভিযুক্তের স্বতন্ত্র ভূমিকার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন থাকা প্রয়োজন। বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নির্ভর করে এসব বিভাজন কতটুকু রক্ষা করা হচ্ছে সে বিষয়টির  ওপর। সর্বোপরি এটি নিশ্চিত করা যে, আইন সমানভাবে এবং সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। ব্যক্তির পদমর্যাদা বা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, বিচারপ্রক্রিয়ার তার ওপর প্রভাব পড়া উচিত নয়।

যেহেতু বাংলাদেশের আইনি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই সব পক্ষের জন্যই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। সবাইকেই খেয়াল রাখতে হবে, তারা যেন এই সময়টি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পার করেন। যেকোনো সমস্যাও দায়িত্বশীলভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। সেইসঙ্গে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, সত্যিই যেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের রক্ষক হিসেবে সেনাবাহিনী যেন তার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে।

যদি সেনাবাহিনী আইন মেনে সহযোগিতা করে, তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেন দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। অন্যথায় এটি ‘বুমেরাং’ হয়ে ফিরে আসতে পারে।

দেশের মানুষের কাছে সেনাবাহিনী হলো শেষ অবলম্বন। কাজেই সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে, এ বাহিনী যেন মনোবল বজায় রেখে দেশপ্রেমের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অগ্রসর বাহিনী হিসেবে কাজ করে যেতে পারে।

কারণ দিন শেষে, এই সেনাবাহিনী আমাদের। এই সেনাবাহিনী জনগণের ও বাংলাদেশের।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad