বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরি (২৭) হত্যা মামলায় তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের (২৩) তৃতীয় দফায় আরও তিন দিনের পুলিশ রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেছে আদালত। হত্যার কারণ ও পরিকল্পনাকারী শনাক্ত, হত্যায় ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনসহ পাঁচটি কারণ দেখিয়ে সাত আবেদন করেছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা।
বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুল ইসলামের আদালতে এ আদেশ দেন। এর আগে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন এ আবেদন করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন।
আদালতে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ভিক্টিম যেদিন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সেদিন এই আসামী দ্বীপ ও দিশা সঙ্গে ছিলেন। এখন পর্যন্ত আটককৃত ২ আসামি অপূর্ণ তিথ্য দিয়েছেন। আটককৃত দুইজন তাহসিফ সাউরির সঙ্গে যে তাদের বন্ধুত্ব এটা কীভাবে হলো এই বন্ধুত্ব করতে কেউ করতে বলেছিলেন কি না তা জানতে রিমান্ড প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিওটি সাউরির করেছিলেন যার ফলে দেশের মানুষ জানতে পারেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়েছেন। সেই ভিডিও প্রকাশের জেরেই কি হত্যাকাণ্ডের শিকার তা খুজে বের করতে হবে, যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম রিমান্ড নামঞ্জুর চেয়ে আবেদন করেন। বলা হচ্ছে শেখ হাসিনা পালানোর ভিডিও সাউরিরি করেছে, সেটা ভুল। ওই ভিডিও সাউরি করেননি।
এদিকে, সাউরির বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, এর আগে আদালতের নির্দেশে গত ৩ নভেম্বর থেকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে ঘটনার বিষয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং কিছু বিষয়ে নীরবতা পালন করেছেন। তার দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।
আবেদনে বলা হয়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপ তাহসিফকে তার বাসা থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান। পরে তাহসিফ, দীপ ও মামলার আরেক সন্দেহভাজন আসামি জেরিকা তাসনিম দিশা (১৯) একসঙ্গে একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে যান। সেখানে মোটরসাইকেলের কাজ করানোর পর তারা বিভিন্ন সময়ে সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসে খাবার খান। পরে রাতে উত্তরা নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে গিয়ে বিয়ার পান করেন। একপর্যায়ে দিশা বাসায় চলে যান।
দীপের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে আবেদনে আরও বলা হয়, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তিনি ও তাহসিফ টঙ্গীর মাজার বস্তিতে পৌঁছান। পরে বস্তির ভেতর দিয়ে তুরাগ নদীর তীরবর্তী একটি মাঠে যান। সেখানে কয়েকজন লোকের উপস্থিতি দেখে তারা আলাদা হয়ে যান বলে দাবি করেছেন দীপ।
তদন্ত কর্মকর্তা আবেদনে উল্লেখ করেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত্যুর আগে সর্বশেষ তাহসিফকে দীপ ও দিশার সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। ঘটনার আগে তাদের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা ও রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। এতে মামলার ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবেদনে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো-তাহসিফকে কেন ও কী কারণে হত্যা করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া; হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার; মূল পরিকল্পনাকারী, সহযোগী কিংবা ভাড়াটে খুনি জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করা; চাক্ষুষ সাক্ষী ও সিসিটিভি ফুটেজের তথ্যের সঙ্গে দীপের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা এবং হত্যার ধরন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্বশত্রুতা, আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি হত্যার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করাও তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য।


