চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে উসকানি, সাহস ও সমর্থন জোগানো, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় সরাসরি অংশগ্রহণ এবং অধীনস্থদের অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার দাবি তুলে পতিত সরকারের সাত প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এনেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি, দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত, দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের অর্থের জোগান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।
অপরাধ সংঘটনে হাসিনাকে পরামর্শ, প্ররোচনা ও সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অধীনস্থদের অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি নীতির আওতায় আনা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মিত্র ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমুসহ দল এবং সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, শাহাজান খান, মির্জা আজম, মুহাম্মদ ফারুক খান, মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক ও দীপু মনি গণঅভ্যুত্থান দমনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।
২০২৪ সালের ১ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র-জনতার সৃষ্ট আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় ও দলীয়ভাবে ষড়যন্ত্র করা হয়। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এসব পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অংশ নেন বলে অভিযোগ।
প্রসিকিউশন জানায়, ১৮ ও ১৯ জুলাই ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের পর ১৯ জুলাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে দেশব্যাপী কারফিউ এবং কারফিউ চলাকালে দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত হয়। আমু, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেননসহ জোটের নেতারা এ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখেন। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
২৯ জুলাই গণভবনে হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়। আমু, ওবায়দুল কাদের, মেনন ও দিলীপ বড়ুয়া এতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। ১ আগস্ট জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করে আন্দোলনকারীদের জামায়াত-শিবিরের সদস্য আখ্যা দিয়ে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করে প্রসিকিউশন।
কারফিউ চলাকালে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলা ও গুলি চালানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল দাবি করে প্রসিকিউশন জানায়, আমু অর্থ সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্তরে বণ্টন করতেন। ৫ আগস্ট রাতে তার বাড়ি থেকে বস্তাভর্তি প্রায় পাঁচ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়। ওই অর্থ আন্দোলন দমনে সশস্ত্র ক্যাডারদের মধ্যে বণ্টনের জন্য রাখা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক গণঅভ্যুত্থান দমন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা ও রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে সম্বোধন করেন।
পরদিন আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলনে আব্দুর রাজ্জাকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা ওই বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’। এর মাধ্যমে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকে দেওয়া হয়। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় নারীসহ প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী আহত হন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান দলীয় পরিকল্পনায় অংশ নেন বলে অভিযোগ করে প্রসিকিউশন। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৮ ও ২০ জুলাই হাসিনার সঙ্গে শাজাহান খান ফোনে কথা বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের পাশাপাশি শ্রমিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যানারে আওয়ামী লীগ কর্মীদের মাঠে নামিয়ে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা করেন। আন্দোলনকারীদের তালিকা করে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়।
এ সময় মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ এবং ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনাও ঘটে। শাজাহান খানের ষড়যন্ত্র ও উসকানিতে ১৮ জুলাই মাদারীপুরে শিক্ষার্থী দীপ্ত দে এবং ১৯ জুলাই শ্রমিক রুমান বেপারী ও তাওহীদ সন্নামত নিহত হন বলে অভিযোগ করে প্রসিকিউশন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণআন্দোলন দমনের পরিকল্পনায় অংশ নেওয়া এবং ১৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে দেশব্যাপী কারফিউ ও ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করে প্রসিকিউশন। অভিযোগে বলা হয়, তার ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও সহায়তায় ২০ জুলাই গাজীপুরে ১২ জন, ৪ আগস্ট মিরপুরে ১২ জন এবং ৫ আগস্ট মিরপুরে ১৮ জনসহ চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে সাহাদাত হোসেন নিহত হন। জুলাই-আগস্টে সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি নিহত ও ২৫ হাজারের বেশি আহত হওয়ার ঘটনায়ও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। অধীনস্থদের অপরাধ ঠেকাতে বা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও তিনি উদ্যোগ নেননি বলে দাবি করা হয়েছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম দলীয় পরিকল্পনা, উসকানি ও অর্থের জোগান দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৫ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের আন্দোলনবিরোধী বক্তব্যের পর ১৭ জুলাই ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সভায় মির্জা আজমসহ দলীয় নেতারা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্তে অংশ নেন। ১৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে দেশব্যাপী কারফিউ ও ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্তের পর দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের মাঠে নামানো এবং তাদের জন্য অর্থের ব্যবস্থা করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথোপকথনে মির্জা আজম কারফিউ চলাকালে ওয়ার্ড পর্যায়ে লোক রাখার জন্য অর্থের প্রয়োজনের কথা বলেন। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তিনি অর্থ সংগ্রহ ও বিভিন্ন স্তরে তা বণ্টন করতেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও তৎকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯ জুলাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলের বৈঠকে দেশব্যাপী কারফিউ ও কারফিউ চলাকালে দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত হয়। ৪ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কমিটির সভায় সদস্য হিসেবে ফারুক খান উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং এর পরবর্তীতে উদ্ভূত গণঅভ্যুত্থান দমনে পরামর্শ, ষড়যন্ত্র ও সহায়তা দেন বলে দাবি করা হয়েছে।


