গণশুনানিতে বাঁচার আকুতি নিয়ে চট্টগ্রামে ডিসির দুয়ারে অসহায়রা

গণশুনানিতে বাঁচার আকুতি নিয়ে চট্টগ্রামে ডিসির দুয়ারে অসহায়রা
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

দিনাজপুর থেকে কাজের সন্ধানে চট্টগ্রামে এসেছিলেন এক ব্যক্তি। কাজ মেলেনি। পকেটের টাকাও ফুরিয়েছে। এখন বাড়ি ফেরার ভাড়াও নেই। অন্যদিকে, ক্যানসার আক্রান্ত আব্দুল্লাহর প্রয়োজন জরুরি অস্ত্রোপচার। কিন্তু কৃষক বাবার পক্ষে চিকিৎসার খরচ জোগানো অসম্ভব। স্বামী ও দুই ছেলেকে হারিয়ে অসহায় আয়েশা বেগমের দিন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে। এমন নানা সংকট নিয়ে তারা হাজির হয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার গণশুনানিতে।

বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক গণশুনানিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর থেকে আসা ২৫ জন সেবাপ্রত্যাশীর অভাব-অভিযোগ ও আবেদন শোনেন জেলা প্রশাসক। অনলাইনে যুক্ত হয়ে জমি নিয়ে বিরোধ ও সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ জানান আরও চার প্রবাসী।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এদিন অসুস্থ ও অসহায় ১২ ব্যক্তি এবং এক শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক। কিছু অভিযোগ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি গৃহীত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ও ফলাফল আবেদনকারীদের জানানোর ব্যবস্থাও করা হয়।

গণশুনানিতে আসা মানুষের আবেদনপত্রে উঠে এসেছে অভাবের সঙ্গে লড়াই, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা আর স্বজন হারানোর বেদনার নানা গল্প।

বাঁশখালীর সরল গ্রামের মো. আব্দুল্লাহ প্রায় এক বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। গত ১৭ অক্টোবর চিকিৎসক তাকে দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। কিন্তু তার বাবা মো. ইদ্রিছ একজন কৃষক। ছয়-সাত সদস্যের সংসার চালিয়ে ছেলের চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। জীবন বাঁচানোর আশায় জেলা প্রশাসকের কাছে সহায়তা চেয়েছেন আব্দুল্লাহ।

পটিয়ার কেলিশহরের বরুন কুমার দে ২০২২ সাল থেকে লিভার ক্যান্সারে ভুগছেন। ভারত ও ঢাকায় চিকিৎসা নিয়েছেন, কেমোথেরাপিও হয়েছে। এখন প্রয়োজন রেডিওথেরাপি। কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসায় সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ায় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।

লোহাগাড়ার মো. কফিল উদ্দীন দেওয়ানহাট দেওয়ানীয়া মসজিদের সহকারী পেশ ইমাম। গলার টিউমারে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন। কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় ভারতে চিকিৎসা নিতে চান। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ নেই তার।

নগরীর কাজির দেউড়ির সুলতান আহমদ সিকদার কিডনি, হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রায় তিন লাখ টাকা। জমানো অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনিও সাহায্যের আবেদন করেছেন।

আরও পড়ুন

বোয়ালখালীর আহলা গাজীপাড়ার দিনমজুর মো. আব্দুল গফুরের স্ত্রী বিবি জয়নাব দুই বছর ধরে গোদ রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। চিকিৎসকেরা তাকে ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত আব্দুল গফুর। অর্থাভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে।

তবে গণশুনানিতে জমা পড়া আবেদনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক একটি সদরঘাটের পূর্ব মাদারবাড়ীর আয়েশা বেগমের। কিডনি ও পাথরজনিত রোগে মারা গেছেন তার স্বামী মনছুর উদ্দীন। পরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বড় ছেলে মো. আবুল কালাম আজাদ। গত বছরের ৩ মে আরেক ছেলেকেও হারান সড়ক দুর্ঘটনায়।

এখন এক বিবাহযোগ্য মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। নিজেও অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। আবেদনপত্রে জানিয়েছেন, কখনও অর্ধাহারে, কখনো অনাহারে দিন কাটছে। স্বামী ও দুই ছেলেকে হারানো এই নারী জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন।

আকবরশাহ এলাকার বেলি আক্তার ও সালমা বেগমের অবস্থাও করুণ। দুজনই বিধবা। স্বামী মারা যাওয়ার পর অন্যের বাসায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অসুস্থতার কারণে এখন আর কাজ করতে পারেন না। চিকিৎসা ও ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই।

বাঁশখালীর আসমা বেগমের স্বামী আট মাস ধরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। চার সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। স্বামীর বিরুদ্ধে মামলাটি মিথ্যা বলে দাবি করে সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন আসমা।

অন্যদিকে, দিনাজপুরের এক ব্যক্তির আবেদন ছিল ভিন্ন। কাজের সন্ধানে কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামে এসে কোনো কাজ পাননি তিনি। হাতে টাকা নেই, খাবারের ব্যবস্থাও নেই। বাড়ি ফেরার গাড়িভাড়াটুকু জোগাড় করতে জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হয়েছেন।

কারও প্রয়োজন কয়েক লাখ টাকার চিকিৎসা, কারও আবার বাড়ি ফেরার সামান্য ভাড়া। আবেদনগুলোর ধরন আলাদা হলেও সবার প্রত্যাশা একই—বিপদের দিনে একটু সহযোগিতা।

এদিকে, অনলাইন গণশুনানিতে অংশ নেওয়া চার প্রবাসী তাঁদের জমি নিয়ে বিরোধ ও সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ তুলে ধরেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণশুনানিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মধ্যে কয়েকটির নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং ফলাফল সেবাপ্রত্যাশীদের জানানোর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

মানবিক ডিসি হিসেবে সারাদেশে পরিচিত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সাপ্তাহিক গণশুনানি অসহায় মানুষের সরাসরি প্রশাসনের কাছে নিজেদের সংকট তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে। এদিন ১৩ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদের অভিযোগ সমাধানে নেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক উদ্যোগ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad