বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) শিল্প কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি নয়, বরং দেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জীবিকার মূল ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শিল্পাঞ্চলগুলোতে যে অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো একক বা তাৎক্ষণিক ঘটনার ফল নয়। সঠিক সময়ে ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিন্যাস না করা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামলাতে নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতা, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শূন্যতা এবং সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর উস্কানি—সব মিলিয়ে এক জটিল ও চতুর্মাত্রিক সংকটের মুখে পড়েছে দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল এই উৎপাদন খাত।
১. মজুরি ঘোষণা ও সময়োচিত সিদ্ধান্তের ঘাটতি:
গার্মেন্টস খাতে অসন্তোষের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কারণ হলো সময়মতো ন্যূনতম মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার না করা। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সার্বিক মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট সময় পর পর শ্রমিকের বেতন সমন্বয় করা যেকোনো শিল্পায়িত দেশের স্বাভাবিক নিয়ম।
তবে বাংলাদেশে মজুরি বোর্ড গঠন ও নতুন মজুরি বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে শ্রমিকদের মনে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনাবোধ দানা বাঁধে। বাজারের সাথে জীবনের চরম অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার পর যখন শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বেতন বাড়ানো হয়, ততক্ষণে শ্রমিক অসন্তোষ রাজপথে গড়ায়। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের এই আগাম প্রাক্কলন ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যর্থতা সার্বিক সংকটকে ঘনীভূত করেছে। গতকাল যে মজুরী বোর্ড গঠন করা হয়েছে মনে হচ্ছে যেন সেটা আন্দোলনের চাপে করা হয়েছে, অথচ সরকার সমস্যা বিবেচনায় এ বোর্ড আগেই গঠন করলে আন্দোলনের সুযোগ কমে যেতো।
২. বেতন বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির অভিঘাত:
গার্মেন্টস শ্রমিকদের ক্ষোভের পেছনে আরেকটি বড় অনুঘটক ছিল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-স্কেল বা বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে তৈরি হওয়া তীব্র মূল্যস্ফীতি। সরকারি খাতে বেতন বাড়ানো, তেল গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি সার্বিক বাজারে দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া এবং পরিবহন খরচ হু হু করে বেড়ে যায়।
যেখানে সরকারি চাকরিজীবীরা বর্ধিত আয়ের সুবিধা পেয়েছেন, সেখানে বেসরকারি খাতের বিশাল নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণি—বিশেষ করে নির্দিষ্ট বেতনে চলা গার্মেন্টস কর্মীরা—তীব্র অর্থনৈতিক চাপে পড়েন। সরকারের পক্ষ থেকে এই বাজারে কার্যকর তদারকি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত সামষ্টিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতা শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনধারণকে কঠিন করে তোলে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম শ্রমজীবী মানুষকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।
৩. রাজনীতিতে সুসংগঠিত নেতৃত্বের শূন্যতা ও দায়িত্বহীনতা:
অর্থনৈতিক সংকটের সাথে যখন রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা যুক্ত হয়, তখন যেকোনো অসন্তোষ অগ্নিকাণ্ডে রূপ নেয়। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় বা তৃণমূল পর্যায়ে সুসংগঠিত, যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের চরম ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
তৃণমূল বা ওয়ার্ড পর্যায়ে সঠিক ও সুশৃঙ্খল কমিটি না থাকার ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর রাজনৈতিক হাইকমান্ডের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা দায়বদ্ধতা থাকছে না। শৃঙ্খলাহীন রাজনৈতিক কর্মীবাহিনী যখন এলাকায় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় বা নিজেই কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ায়, তখন সার্বিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক অভিভাবক না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. ঝুট ব্যবসা ও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর চতুর্মাত্রিক চক্রান্ত:
রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতার সুযোগে পোশাক অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে (যেমন: আশুলিয়া, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ) একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গার্মেন্টস কেন্দ্রিক কোটি কোটি টাকার ‘ঝুট ব্যবসা’, স্থানীয় দখলদারি এবং চাঁদাবাজির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে বিভিন্ন উপদল নিজেদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করছে।
শ্রমিকদের খাদ্য ও মজুরির ন্যায্য আন্দোলনকে এরা খুব সহজেই ‘হাইজ্যাক’করে নিজেদের রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। শিল্পাঞ্চলে গুজবের ডালপালা ছড়িয়ে কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং শ্রমিকদের উস্কানি দিয়ে মূল সংকট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা স্পষ্ট। ফলে সমস্যাটি এখন কেবল ‘মালিক বনাম শ্রমিক’ দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই; এটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সন্ত্রাসী চক্রের এক চতুর্মাত্রিক অরাজকতায় রূপ নিয়েছে।
উত্তরণের উপায়: নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কার
এই বহুমাত্রিক সংকট ও রাজনৈতিক দুষ্ট চক্র ভাঙতে হলে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে-
স্বয়ংক্রিয় মজুরি সমন্বয় নীতি: ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা না করে, বার্ষিক মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নির্দিষ্ট শতাংশে বেতন বৃদ্ধির স্থায়ী রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে।
শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা: মূল পে-স্কেলের চাপ সামলাতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য সরকার ও মালিকপক্ষের যৌথ অর্থায়নে সুলভ মূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহ (রেশন ব্যবস্থা) এবং কম খরচে বসবাসের জন্য বিশেষ আবাসন ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চা: রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও তৃণমূল সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করতে হবে। এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ ও ঝুট ব্যবসা কেন্দ্রিক সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের কঠোর রাজনৈতিক বিচার করতে হবে।
ঝুট ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: ঝুট ব্যবসাকে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা স্থানীয় নেতার ‘দখলদারির বস্তু’ না বানিয়ে ওপেন টেন্ডার বা ই-অকশনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে, যেন এর থেকে প্রাপ্ত অর্থ কারখানার শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিলে ব্যবহার করা যায়।
শিল্প পুলিশের কার্যকারিতা: রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে শিল্প পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্বাধীনভাবে কারখানা ও এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো বহিরাগত বা সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী উস্কানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের পোশাক খাত ও এর সাথে জড়িত কোটি কোটি মানুষের জীবিকা রাজনৈতিক দল বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের খামখেয়ালিপনার শিকার হতে পারে না। পোশাক শিল্প ভেঙে পড়লে তার প্রভাব কেবল মালিকদের ওপর পড়বে না, বরং পুরো দেশের জাতীয় অর্থনীতি ধসে পড়বে। সুতরাং, সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত বেতন সমন্বয়, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং সুযোগসন্ধানী উস্কানিদাতাদের কঠোর হস্তে দমনের মাধ্যমে পোশাক খাতের স্থায়িত্ব বজায় রাখা এখন জাতীয় প্রধান দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ


