দইয়ের সুন্দর লালচে-কমলা রঙ দেখে লোভ জাগে না, এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই রঙের উৎস একটি গাছের বীজ?
সিলেট অঞ্চলে এই গাছটির নাম ‘দইগোটা’ বা দই রাঙানোর গাছ। এই গাছ থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক রং খাবার, প্রসাধনসহ নানা কিছু তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। তবে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে এই গাছের উপাদান দিয়ে তৈরি জিনিস খাওয়া নিয়ে সতর্ক করেছেন এক কৃষিবিজ্ঞানী।
এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘বিক্সা ওরেলানা’, আর ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘লিপস্টিক ট্রি’। বাংলাদেশে এলাকাভেদে একে দইগোটা, লটকনগোটা, রঙগোটা, সিঁদুরি ও সিঁদুর ফুলও বলা হয়।
কেউ কেউ একে জাফরান ফুলও মনে করেন। তবে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ পরিষ্কার জানিয়েছে, এটি আসল জাফরান নয়।
মৌলভীবাজার শহরের বর্শিজোড়া ইকোপার্কের কাছে বন বিভাগের সিলেট কার্যালয়ের উঠানে এমন একটি গাছ রয়েছে।
গাছটিতে এখন ফ্যাকাশে গোলাপি-সাদা ফুলের পাশাপাশি লালচে রঙের ফল ধরেছে। ফলগুলোর গায়ে নরম অনেক কাঁটা থাকায় দূর থেকে লোমশ দেখায়। একই ডালে ফুল, কুঁড়ি এবং পাকা ফল—সবই একসঙ্গে দেখা মিলছে।
গাছের গোড়ায় লাগানো সাইনবোর্ডে একে ‘দুর্লভ প্রজাতি’ বলা হয়েছে; এর নাম লেখা হয়েছে ‘সিঁদুর’ বা ‘লটকা’।
আমেরিকা মহাদেশের এই গাছটি সপ্তদশ শতকে স্প্যানিশদের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসে। চিরহরিৎ এই গুল্মজাতীয় গাছটি লম্বায় সাধারণত চার থেকে পাঁচ মিটার হয়। শরৎ থেকে শীতের শুরু পর্যন্ত এতে ফুল ফোটে।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সারোয়ার জানান, গাছটি সবাই সিঁদুর গাছ হিসেবেই চেনে।
টাইমস’কে তিনি বলেন, ‘এই গাছের রঙ দইয়ে ব্যবহার করা হয় বলেই মানুষ এর নাম দিয়েছে দইগোটা। আমাদের অফিসের উঠানে গাছটি গত ১০-১২ বছর ধরে আছে। প্রতি বছরই এতে ফুল-ফল ধরে।’
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব অনুষদের ডিন ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. শহিদুল ইসলাম জানান, এই গাছটি মূলত প্রাকৃতিক রঙের এক চমৎকার উৎস। দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাপড় ও সুতা রাঙাতে এটি ব্যবহার করা হয়। গাছটি নিজে থেকে কোনো ক্ষতি করে না বা বিষাক্তও নয়।
তবে এটিকে আসল জাফরান ভেবে ভুল করার ব্যাপারে তিনি সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘অনেকে এটিকে আসল জাফরান বলে চালিয়ে দেন বা বিক্রি করেন, যা ঠিক নয়।’
বাংলায় একে ‘রঙ দানা’ও বলা হয় এবং এটি ‘বিক্সাসিয়া’ পরিবারের গাছ।
শহিদুল ইসলাম জানান, সিলেটে এই গাছ সচরাচর দেখা না গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকায়, বিশেষ করে বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের রাস্তার পাশে এটি প্রাকৃতিকভাবে বেশ ভালোই জন্মায়।
বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ না হওয়া এবং কোনো রকম যত্ন ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠার কারণে অনেকে একে দুর্লভ গাছ মনে করেন।
গাছের রং খাবারে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তা খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এই কৃষিবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা ছাড়াই বিরিয়ানি বা দইয়ের মতো খাবারে রঙের জন্য এটি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া ঠিক হবে না।’
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ এই উদ্ভিদ নিয়ে কোনো গবেষণা করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার বলেও তিনি মনে করেন।


