মাটির উর্বরতা রক্ষা, পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন ও টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারে ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা। তারা বলেছেন, দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জৈব সারের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সুস্থ মাটি, ফসল ও পরিবেশের জন্য জৈব সার উৎপাদনকে উৎসাহিত করা এবং ভর্তুকি প্রদান’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ (বারি) ২০টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
বৈঠকে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক ও উদ্যোক্তারা জৈব সার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তুলে বলেন, জৈব সার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় নানা প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হয়। এ ছাড়া সারের মান যাচাই ও পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বাজারে মানসম্মত জৈব সার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বক্তারা বলেন, জৈব সার ব্যবহারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফসলের তাৎক্ষণিক উৎপাদন রাসায়নিক সারের তুলনায় কম হতে পারে। তবে মাটির স্বাস্থ্য ও ফসলের গুণগত মান বজায় রাখতে জৈব সারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাসায়নিক সারের ব্যবহার পুরোপুরি বাদ না দিয়ে মাটি ও ফসলের ধরন অনুযায়ী জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথম কারিগরি অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. এম. আব্দুস সালাম জৈব সার উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন এবং এ প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত চান।
আলোচনায় জৈব সার উৎপাদনের কাঁচামালের প্রাপ্যতা ও বৈচিত্র্য, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সারের প্রয়োগমাত্রা নির্ধারণ এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার বিষয়গুলো উঠে আসে। পাশাপাশি, কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং জৈব সারের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
সংসদ সদস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মোছা. সাবিরা সুলতানা বলেন, ‘একজন মাকে সুস্থ রাখতে পারলে যেমন সুস্থ সন্তানের জন্ম নিশ্চিত করা সম্ভব, তেমনি মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারলে পুষ্টিমানসম্পন্ন ফসল উৎপাদন করা যাবে।’
জৈব সারের মান নিশ্চিত করে বাজারজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরও বলেন, কৃষকদের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে কৃষি কার্ডের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষক নির্বাচন এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। অংশগ্রহণকারীদের জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও কর্মপরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
দ্বিতীয় কারিগরি অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালক মো. আনোয়ার ফারুক জৈব সার উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করতে জেলা পর্যায়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, ‘কৃষিব্যবস্থাকে টেকসই করতে প্রাকৃতিক পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। মাটির স্বাস্থ্য ও কাঙ্ক্ষিত পিএইচ মাত্রা বজায় রাখতে জৈব বালাইনাশক ও জৈব সারের সুষম ব্যবহার জরুরি। তবে কৃষকদের কাছে সময়মতো সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্য পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।’
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করতে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এজন্য জৈব সারের মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণে অনিয়ম দূর করা এবং উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তন আনতে সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও জানান তিনি।


