দেড়শ মাছ পরীক্ষায় মিলল ৯০ প্লাস্টিক কণা

দেড়শ মাছ পরীক্ষায় মিলল ৯০ প্লাস্টিক কণা
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

দেশের অন্যতম আমিষের উৎস এবং অন্যতম বাণিজ্যিক পণ্য মিঠাপানির মাছ চাষে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিককে নতুন ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি মাছের পুকুরের তলদেশের পলি এবং ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করে ৯০টি প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা।

পাশাপাশি গবেষণায় মাছের প্রজাতি, বসবাসের স্তর ও খাদ্যাভ্যাসভেদে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের হারে পার্থক্য দেখা গেছে। এতে জলজ পরিবেশের মান ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. বদিউজ্জামান খানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার: এভিডেন্স অব সেডিমেন্ট–ফিশ ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ইকোলজিক্যাল রিস্কস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছ চাষের পুকুরের পলি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি, বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে।

গবেষণার অংশ হিসেবে ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি বাণিজ্যিক মাছের খামার থেকে পুকুরের তলদেশের পলি ও ছয় প্রজাতির মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মাছের প্রজাতিগুলো হলো- রুই, কাতলা, পাঙাশ, মৃগেল, কমন কার্প ও সরপুঁটি। প্রতিটি প্রজাতি থেকে ২৫টি করে মোট ১৫০টি মাছ নিয়ে রাসায়নিক ও অণুবীক্ষণিক বিশ্লেষণ করা হয়।

বিশ্লেষণে মাছের পরিপাকতন্ত্রে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। প্রতি মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে শূন্য দশমিক ৬০টি কণা শনাক্ত হয়েছে।

প্রজাতিভেদে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের মাত্রায় পার্থক্য দেখা গেছে। সরপুঁটি-তে গড়ে সবচেয়ে বেশি, প্রতি মাছে ১ দশমিক ২০টি কণা পাওয়া গেছে। রুই ও কালিবাউশে এ হার ছিল গড়ে শূন্য দশমিক ৬৮টি করে।

অন্যদিকে, পরীক্ষা করা ২৫টি পুকুরের প্রতিটির তলদেশের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রতি কেজি পলিতে গড়ে ১১ দশমিক ০৪টি কণা শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় প্রজাতিভেদে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার হারেও পার্থক্য দেখা গেছে। পাঙাশে এ হার সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ, রুইয়ে ৩৬ শতাংশ। এ ছাড়া, কাতলা ও মৃগেলে ২০ শতাংশ করে এবং কমন কার্প ও সরপুঁটিতে ১৬ শতাংশ হারে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন

মাছের বসবাসের স্তর ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সম্পর্ক দেখা গেছে। পুকুরের তলদেশে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে গ্রহণের হার ৫২ শতাংশ। মধ্যস্তরে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে এ হার ৩৫ শতাংশ এবং পানির উপরিভাগে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ। খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে সর্বভুক মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের হার ৫৮ শতাংশ, আর তৃণভোজী মাছের ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ।

পুকুরের পানি পরীক্ষা। ছবি: সংগৃহীত

 

গবেষণায় মাছের শারীরিক অবস্থা নির্ণয়ের সূচকও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তুলনামূলক কম মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণকারী সরপুঁটিতে ফাল্টনের কন্ডিশন ফ্যাক্টর বা কে-মান সর্বোচ্চ ২ দশমিক ২৭ পাওয়া গেছে। বিপরীতে কাতলা ও পাঙাশে এ মান ছিল যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৩৫ ও শূন্য দশমিক ৩৭। পুকুরের পলিতে দূষণের মাত্রা বেশি।

পুকুরের তলদেশের পলিতে প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা নির্ণয়ে গবেষকেরা পলিউশন লোড ইনডেক্স (পিএলআই) ব্যবহার করেন। নমুনাগুলোতে এ সূচকের মান ছিল ১ থেকে ৪ দশমিক ৫। কয়েকটি নমুনায় দূষণের মাত্রা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পাওয়া গেছে।

গবেষকদের মতে, পুকুরের তলদেশের পলি মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি আধার হিসেবে কাজ করতে পারে। পলি থেকে এসব কণা মাছের খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে। ফলে মাছের বসবাসের পরিবেশ ও খাদ্য সংগ্রহের ধরন মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্লাস্টিকের ব্যাগ, জাল ও পাইপ সম্ভাব্য উৎস

মাছ ও পলির নমুনায় শনাক্ত প্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে একাধিক ধরনের পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মাছের পরিপাকতন্ত্রে শনাক্ত কণার মধ্যে পলিপ্রোপিলিন ছিল ২৪ শতাংশ, পলিস্টাইরিন ২১ শতাংশ, পলিকার্বনেট ১৯ শতাংশ, সেলুলোজ অ্যাসিটেট ১৫ শতাংশ, পলিইথিলিন টেরেফথালেট ১৩ শতাংশ এবং পলিইথিলিন ৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, পুকুরের পলিতে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পলিইথিলিন—৩৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে পলিপ্রোপিলিন ২৭ শতাংশ।

গবেষকদের বিশ্লেষণে মাছের খাদ্যের প্লাস্টিকের ব্যাগ ও প্যাকেজিং, মাছ ধরার নাইলন ও পলিয়েস্টারের জাল, পুকুরের পাড়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ত্রিপল এবং সেচকাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাইপের ক্ষয়কে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মাছের পরিপাকতন্ত্রে পাওয়া কণার মধ্যে ১ থেকে ৫ মিলিমিটার আকারের কণার আধিক্য ছিল। আকৃতির দিক থেকে খণ্ডিত ও অনিয়মিত কণা এবং তন্তু বা ফাইবার বেশি পাওয়া গেছে। রঙের মধ্যে কালো কণার পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ।

মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে বোঝানো হয়। প্লাস্টিকজাত বর্জ্য ভেঙে পরিবেশে এসব কণা তৈরি হতে পারে। জলাশয়ের তলদেশে জমে থাকা কণা মাছের খাদ্যগ্রহণের সময় পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে।বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরে এসব কণার উপস্থিতি জলজ পরিবেশের মান ও খাদ্যনিরাপত্তা মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

প্রধান গবেষক মো. বদিউজ্জামান খান বলেন, ‘গবেষণায় মাছের পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষা করা হলেও মানুষের খাওয়ার উপযোগী মাছের পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার পরিমাণ সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি। ফলে এসব মাছ খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে বা এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব কী, তা এই গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যৎ গবেষণায় মাছের পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং ভারী ধাতু ও অন্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের সঙ্গে এর সম্মিলিত প্রভাব পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি মাছের খামারে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যাগ, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম যথাযথভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার, পুকুরে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ, পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার এবং পুকুরের পানি ও পলির গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad