পিরোজপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘ধাপ’ চাষ, পানির বুকে ভাসমান স্বপ্ন

পিরোজপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘ধাপ’ চাষ, পানির বুকে ভাসমান স্বপ্ন
ঐতিহ্যবাহী ধাপ চাষ। ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলমগ্ন জনপদে বর্ষা মানেই অনেক কৃষকের জন্য চাষের জমি হারানোর আশঙ্কা। চারদিকে থইথই পানিতে ডুবে যায় ফসলি জমি, বন্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক কৃষিকাজ। কিন্তু পিরোজপুরের কৃষকেরা চারপাশের এই থইথই পানিকে বাধা হিসেবে না নিয়ে, বরং এই পানিতেই বেঁচে থাকার এক অসাধারণ কৌশল রপ্ত করেছেন। যে জমি একসময় ছিল জীবিকার প্রধান অবলম্বন, বর্ষার পানিতে সেই জমিই যখন হয়ে ওঠে চাষের অনুপযোগী। তখন পিরোজপুরের কৃষকেরা এই পানিকেই দেখেছেন নতুন সম্ভাবনার উৎস হিসেবে। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই না করে, তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তারা গড়ে তুলেছেন এক অনন্য কৃষিব্যবস্থা—পানির বুকে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান বাগান, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ধাপ’ নামে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা পানির বুকে ভাসিয়ে চলেছেন তাদের এই স্বপ্ন, শ্রম আর জীবিকার প্রতীক। এই ঐতিহ্য শুধু কৃষিকাজের একটি কৌশল নয়, এটি প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, সৃজনশীলতা দিয়ে সংকটের মোকাবিলা করা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক জীবন্ত গল্প।

পানির বুকে গড়ে ওঠে সবুজের সংসার

কচুরিপানা, বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও পচনশীল জৈব উপাদান স্তরে স্তরে সাজিয়ে তৈরি করা হয় এসব ভাসমান বেড। তার ওপর রোপণ করা হয় নানা ধরনের সবজি ও চারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে সবুজে ঘেরা একেকটি ভাসমান কৃষিক্ষেত্র। বর্ষার পানিতে যখন আশপাশের জমি তলিয়ে যায়, তখনো এই বাগানগুলো ভেসে থাকে পানির বুকে। জমি ডুবে গেলেও থেমে থাকে না চাষাবাদ। পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এসব ভাসমান বাগানের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে সবচেয়ে বেশি।

ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস

নৌকায় ভেসে আসে জীবিকার গল্প

ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় কৃষকদের কর্মব্যস্ততা। ছোট ছোট নৌকায় চড়ে তারা ছুটে যান নিজেদের ভাসমান বাগানের দিকে। কেউ নতুন ধাপ তৈরি করেন, কেউ যত্ন করে রোপণ করেন সবজির চারা, আবার কেউ সদ্য তোলা ফসল নৌকায় সাজিয়ে রওনা দেন স্থানীয় বাজারের উদ্দেশে। এই বাগান তাদের কাছে কেবল কৃষিকাজের একটি পদ্ধতি নয়; এটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর উপায়, জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন এবং বংশপরম্পরায় লালিত এক ঐতিহ্য। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কিংবা ভারী বৃষ্টিপাত–কোনোকিছুই তাদের থামিয়ে রাখতে পারে না সহজে। যে পানি একসময় কৃষির জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনত, সেই পানিই আজ তাদের জীবিকার ক্ষেত্র, সম্ভাবনার উৎস।

জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে এক অনন্য অভিযোজন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে দেশের বহু অঞ্চলে কৃষিজমি ও কৃষিনির্ভর মানুষের জীবিকা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় পিরোজপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘ধাপ’ চাষ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

যখন বন্যার পানিতে ডুবে যায় চাষযোগ্য জমি, তখন কৃষকেরা পানির ওপরই তৈরি করেন নতুন চাষের ক্ষেত্র। এ পদ্ধতিতে প্রচলিত অর্থে উর্বর জমি কিংবা শুকনো মাটির প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন কচুরিপানা, জলজ উদ্ভিদ, জৈব উপাদান আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান। এই পদ্ধতি দেখায়, কৃষির জন্য সব সময় শুকনো জমিই একমাত্র ভরসা নয়; স্থানীয় পরিবেশ, সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদান এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েও গড়ে তোলা সম্ভব বিকল্প জীবিকার পথ।

মৌসুমি জলাবদ্ধতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া এই পদ্ধতি আজ জলবায়ু সহনশীল কৃষির এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। এটি আমাদের শেখায়, প্রতিকূল পরিবেশেও মানুষের সৃজনশীলতা, অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতিকে বোঝার ক্ষমতা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, সহাবস্থান

সবুজ জলপথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে ছোট ছোট কাঠের নৌকা। দুপাশে ভেসে থাকে সবজির বাগান। কেউ ব্যস্ত চারার যত্নে, কেউ ফসল সংগ্রহে, কেউ আবার বাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত। এই দৃশ্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর উপলব্ধি–টিকে থাকার অর্থ সব সময় প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করা নয়; কখনো কখনো প্রকৃতির ভাষা বুঝে, তার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় বেঁচে থাকার পথ।

আরও পড়ুন

পিরোজপুরের কৃষকেরা সেই পথই বেছে নিয়েছেন। তারা পানিকে কেবল দুর্যোগ হিসেবে দেখেননি; বরং তার বুকেই খুঁজে নিয়েছেন নতুন জমি, নতুন সম্ভাবনা আর জীবনের অবিরাম প্রবাহ।

তাদের এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি অঞ্চলের কৃষি ঐতিহ্যের গল্প নয়, বরং পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে মানুষের অভিযোজনক্ষমতারও এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।

ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস

পানির সঙ্গে ভাসুক আগামীর স্বপ্ন

পিরোজপুরের মানুষের কাছে ভাসমান বাগান শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি নয়; এটি তাদের জীবনযাত্রার অংশ, সংস্কৃতির পরিচয় এবং প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার এক জীবন্ত গল্প। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতের জলবায়ু-সংকট মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পানি বাড়লে ধাপও ভেসে ওঠে। আর সেই ভাসমান সবুজের বুকে কৃষকেরা বুনে চলেন নতুন দিনের স্বপ্ন। তারা বীজ বোনেন, ফসল ফলান, ফসল ঘরে তোলেন–প্রতিটি কাজে প্রমাণ করেন, প্রতিকূলতা যতি আসুক, মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি আর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তার চেয়েও গভীর। কারণ, প্রতিকূলতা মানেই থেমে যাওয়া নয়।

ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস

 

পিরোজপুরের জলমগ্ন জনপদে তাই ভাসমান বাগান শুধু পানির ওপর ভেসে থাকা এক টুকরো জমি নয়। এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান এবং আশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এক অনন্য প্রতীক।

পানির বুকে ভেসে থাকা সবুজ বাগান, আর সেই সবুজের বুকেই বেঁচে থাকে কৃষকের স্বপ্ন। যত দিন ধাপ ভেসে থাকবে, তত দিন পিরোজপুরের জলপথে বয়ে চলবে শ্রমের গল্প, ফসলের সুবাস আর নতুন দিনের প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন: বগুড়ায় ‘ভ্যানিলা’ চাষ, অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad