সিরাজগঞ্জে জলপাইয়ের মৌসুমে বাগবাটির হাটে টক ফলের উৎসব

সিরাজগঞ্জে জলপাইয়ের মৌসুমে বাগবাটির হাটে টক ফলের উৎসব
জলপাই। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

চারদিকে সবুজের সমারোহ, গাছে গাছে ঝুলছে কাঁচা জলপাই। সকাল হলেই সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাগবাটি হাটে শুরু হয় জলপাই বেচাকেনার ধুম। কেউ ভ্যানভর্তি জলপাই নিয়ে আসছেন, কেউবা কাঁধে বস্তা নিয়ে ছুটছেন হাটে। কোথাও চলছে ফল বাছাই, কোথাও দরদাম, আবার কোথাও ট্রাকে তোলা হচ্ছে বস্তাভর্তি জলপাই। সব মিলিয়ে জলপাইয়ের মৌসুমে বাগবাটিতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ।

প্রতিদিন এ হাটে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মেট্রিক টন জলপাই বেচাকেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ফরিদপুর, মাদারীপুর, ভাঙ্গা, টেকেরহাট, মানিকগঞ্জ ও ঢাকা থেকে আসছেন পাইকারি ক্রেতারা। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম কম থাকায় উৎপাদন ও শ্রমিকের খরচ তুলে লাভের মুখ দেখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অনেক চাষি ও ব্যবসায়ী।

বাগবাটি ইউনিয়নের ঘোড়াচড়া, হরিনা বাগবাটি, খাগা, সুবর্ণগাতি ও ফুলকোচা গ্রামের মানুষের কাছে জলপাই এখন আয়ের অন্যতম উৎস। তুলনামূলক কম পরিচর্যায় উৎপাদিত এ ফল বিক্রি করেই অনেক কৃষক পরিবারের সংসার চলে। আশ্বিন থেকে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই তিন মাস জলপাই সংগ্রহ ও বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করেন তারা।

ঘোড়াচড়া গ্রামের জলপাই ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন টাইমসকে বলেন, এ বছর ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম কম। প্রতি কেজি জলপাই বিক্রি হচ্ছে আট থেকে ১২ টাকা দরে। সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ২৭ থেকে ২৮ লাখ টাকার জলপাইগাছ কিনেছেন তারা। প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। প্রত্যেককে মজুরি দিতে হয় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। সব খরচ হিসাব করে এ বছর লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।

তিনি আরও জানান, জলপাই সংগ্রহের পর আকার অনুযায়ী ছোট, মাঝারি ও বড় এই তিন ভাগে বাছাই করা হয়। বড় ও মাঝারি আকারের ফল বাজারে বিক্রি হয়, আর ছোট আকারের জলপাই সরবরাহ করা হয় বিভিন্ন কোম্পানিতে। প্রতিদিন হাটে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার জলপাই কেনাবেচা হয় বলেও জানান তিনি।

হাটে জলপাই বাছাই ও পরিবহনের কাজ করছেন শ্রমিক ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা প্রথমে জলপাই ছোট-বড় আলাদা করি। এরপর সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে পরিষ্কার করে বস্তায় ভরে ট্রাকে তুলি। শুকানোর প্রয়োজন হয় না, পরিষ্কার করেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ছবি: টাইমস

 

আরও পড়ুন

ফল বিক্রেতা আব্দুর রশিদ ভূঁইয়া টাইমসকে জানান, জলপাইয়ের আকার ও মানের ওপর নির্ভর করে দাম। ভালো মানের জলপাই প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, মাঝারি মানের জলপাই ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং ছোট আকারের জলপাই ৩০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। তার ভাষ্য, অনেক কৃষক আগেই নিজের পুঁজি খাটিয়ে গাছ কেনেন। পরে শ্রমিকের মজুরি দিয়ে ফল বিক্রি করতে হয়। বাজারে দাম কম থাকলে তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়।

কৃষক নজরুল ইসলাম মল্লিক টাইমসকে বলেন, আশ্বিন মাস থেকে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ পর্যন্ত জলপাই পাড়ার মৌসুম। এ বছর বৃষ্টি ও আবহাওয়ার প্রভাবে কিছু ফলের আকার ছোট হয়েছে। এতে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। জলপাই চাষে কৃষকদের সরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

জলপাই সংগ্রহের প্রক্রিয়াও বেশ শ্রমসাধ্য। গাছ থেকে ফল নামানোর সময় নিচে জাল বা নেট ব্যবহার করতে হয়। তা না হলে মাটিতে পড়ে অনেক ফল ফেটে যায় এবং বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই ফলের মান ঠিক রাখতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেন শ্রমিকেরা।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম নাসিম হোসেন টাইমসকে বলেন, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় ধান ও বিভিন্ন শাকসবজির পাশাপাশি লেবু, মাল্টা, ড্রাগন ফল ও জলপাইয়ের চাষ হচ্ছে। চলতি বছর উপজেলায় ৫০ হেক্টর জমিতে জলপাই আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১০ মেট্রিক টন। সাধারণত আশ্বিন, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস জলপাইয়ের মৌসুম। জলপাই ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ একটি ফল বলেও জানান তিনি।

সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা টাইমসকে বলেন, চলতি বছর জেলাজুড়ে ১০১ হেক্টর জমিতে জলপাই চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ থেকে ১ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন জলপাই উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। জলপাই একটি সম্ভাবনাময় ফল। এর বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, উন্নত পরিচর্যা ও ফল সংগ্রহের সঠিক কৌশল সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। এতে ফলের গুণগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি উৎপাদন ও কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। জলপাইয়ের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা এই ফল চাষে আরও উৎসাহিত হবেন। পাশাপাশি সংগ্রহ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে জলপাই চাষকে আরও লাভজনক করা সম্ভব হবে।

বাগবাটির জলপাইয়ের হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের জীবিকারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভোর থেকে দিনভর হাটে চলে ব্যস্ততা, দরদাম আর পণ্য পরিবহনের কাজ। সবুজ জলপাই ঘিরে তৈরি হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির এক কর্মচঞ্চল চিত্র।

তবে ভালো ফলনের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে এই সম্ভাবনাময় ফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জলপাইয়ের দাম নিশ্চিত করা এবং চাষিদের পাশে সরকারি সহায়তা বাড়ানোই এখন স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন: রাজবাড়ীতে সবজির দাম বাড়তি, বিপাকে নিম্ন আয়ের মানুষ

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad