ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব কাটতে না কাটতেই পূর্ব সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকি পল্লীতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে দুই দিন সাগরে মাছ ধরতে না পারলেও রোববার সকাল থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করেছেন জেলেরা। সাগরে জাল ফেলতেই উঠছে প্রচুর মাছ—যার মধ্যে রয়েছে লইট্যা, ছুরি, লাক্ষা, রূপচাঁদা, কোরাল ও জাবা।
মাছের প্রাচুর্য দেখে শরণখোলা রেঞ্জের আলোরকোল, মাঝেরকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শ্যালার চর শুঁটকি পল্লীতে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। এতে জেলে, বহদ্দার ও ব্যবসায়ীদের মুখে ফুটেছে আনন্দের হাসি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে তারা আশা করছেন, এবার আগের মৌসুমের লোকসান ও ঋণের বোঝা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
বন বিভাগ জানায়, পূর্ব সুন্দরবনের দুবলার চরের প্রায় ৮১ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে অবস্থিত দুবলা জেলে পল্লী। দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৮০ ভাগই এই চর থেকে আসে। প্রতিবছর অক্টোবরের শেষ দিক থেকে শুরু হয়ে মার্চের শেষ পর্যন্ত চলে এই শুঁটকি তৈরির কর্মযজ্ঞ। চলতি মৌসুম শুরু হয়েছে ৩০ অক্টোবর এবং চলবে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত। এই পাঁচ মাস সাগর থেকে মাছ ধরে শুঁটকি তৈরি করবেন জেলেরা।
এবার শুঁটকি উৎপাদনে অংশ নিতে দুবলার চারটি চরে জড়ো হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি জেলে, বহদ্দার, মহাজন ও মৌসুমি ব্যবসায়ী। তাদের থাকার জন্য ১ হাজার ১৮টি ঘর, মাছ সংরক্ষণের জন্য ৬৭টি ডিপো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ১১৬টি দোকানঘর নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে বন বিভাগ। তবে পল্লীগুলোতে এখনো ঘর ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরির কাজ চলছে, যা শেষ হতে আরও এক-দুই দিন লাগতে পারে।
আলোরকোলের রামপাল জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির শেখ বলেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় জেলেরা নৌকার বহর নিয়ে সাগরে নেমেছেন এবং জাল ফেললেই প্রচুর মাছ পাচ্ছেন। বড় কোনো দুর্যোগ না এলে এবারের মৌসুম ভাল যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চাকলা জেলে সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রউফ মেম্বর জানান, এখন জেলেদের দম ফেলারও সময় নেই। সাগরে শত শত নৌকা মাছ ধরছে এবং কেরিং বোটে করে সেই মাছ পল্লীতে এনে নামানো, ধোয়া, বাছাই ও শুকানোর কাজে সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন।
দুবলার চর ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের আশঙ্কা থাকলেও সাগরের আবহাওয়া ভালো থাকায় জেলেরা প্রচুর মাছ পাচ্ছেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে মহাজনরা গত মৌসুমের লোকসান ও ঋণের দেনা শোধ করতে পারবেন।
তবে মাছের প্রাচুর্যে স্বস্তি ফিরলেও জেলেদের মনে জলদস্যু আতঙ্ক রয়ে গেছে বলে জানান কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, সুন্দরবন ও সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেরা দস্যুদের হামলা, অপহরণ ও মুক্তিপণের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন। এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, এসআরবি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছে ফিশারমেন গ্রুপ।
দুবলা জেলে পল্লী বিশেষ টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মো. খলিলুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কেটে যাওয়ায় জেলেরা সময় নষ্ট না করে রোববার থেকেই সাগরে মাছ ধরা ও তা প্রক্রিয়াকরণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, অস্থায়ী ঘর তৈরির জন্য সুন্দরবনের কোনো গাছপালা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষেধ করা হয়েছে। জেলেদের নিজেদের দেশীয় সরঞ্জাম সঙ্গে নিতে বলা হয়েছে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে দুবলার চর থেকে ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই চর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ কোটি ৩৭ লাখ ২২ হাজার ৪৯৩ টাকা।


