তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক আন্দোলনের নেপথ্যে কলকাটি নাড়ছে আওয়ামী লীগ। দেশের শিল্পাঞ্চল এলাকার ২০ থেকে ২২ জন নেপথ্য খলনায়কের নামের একটি তালিকাও সরকারে কাছে আছে।
এই গ্রুপের সঙ্গে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন এবং বামপন্থী শ্রমিকনেতাদের তৎপরতার কথা জানতে পেরে সরকার কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠনের নেতারাও বিষয়টিতে রাজনৈতিক ইন্ধন খুঁজে পাচ্ছেন।
শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি ও উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি আগামী ডিসেম্বরকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা জানতে পেরেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জরুরি নির্দেশনা দিয়েছেন। রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কয়েকজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে জরুরি বৈঠকে এমন নির্দেশনা দেন।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকেও আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, চলমান শ্রমিক আন্দোলনের নেপথ্যে আওয়ামী লীগ ও দলটির সমর্থক যে শ্রমিকনেতার ভূমিকা রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের কয়েকজনকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করেছে।
এদিন সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এ জরুরি বৈঠক শুরু হয়। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র চলছে। আন্দোলনে মুখোশধারীরা ঢুকে পড়েছে এবং সীমান্তের ওপার থেকেও ইন্ধন দেওয়ার তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে, যা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলায় জড়িতদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হবে। তার দাবি, প্রকৃত শ্রমিকেরা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নন।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে কারখানা চালু রেখে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে পোশাক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে সরকার তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে। কারখানাগুলোর উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বজায় থাকে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রোববার দিনভর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ২৮ জন নেতাকর্মীকে আটকের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
শ্রমিক আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ সম্পর্কে বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান টাইমসকে বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাওয়া কোনো গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ইন্ধন এ অস্থিরতার পেছনে থাকতে পারে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত। প্রকৃত শ্রমিকেরা জানেন, বর্তমান চ্যালেঞ্জিং ব্যবসায়িক পরিস্থিতিতে তাদের কারখানার মালিকেরা কতটা মজুরি বাড়াতে সক্ষম।
এদিকে, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের জেরে রোববার ৩ শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার।
অন্যদিকে, পোশাকশিল্পে বিশৃঙ্খলা ও কারখানা ভাঙচুর বন্ধ না হলে মালিকেরা কারখানা চালু রাখতে চাইবেন না বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু।
রোববার সন্ধ্যায় নিজ কার্যালয়ে তিনি বলেন, মালিকেরা প্রতিদিনই কারখানা পরিচালনা করতে চান। কিন্তু কারখানা চালানোর মতো পরিবেশ না থাকলে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়টি শ্রমিকদের আগেই জানানো হয়েছিল। এরপরও বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা হয়েছে। এ ঘটনায় উদ্যোক্তারা উদ্বিগ্ন। যারা আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকেরা যে চাপের মধ্যে রয়েছেন, তা মালিকপক্ষও উপলব্ধি করে। তবে বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার সক্ষমতা ধরে রাখাও জরুরি। সরকার, মালিক ও শ্রমিক, তিন পক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত মজুরি বোর্ড আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে বোর্ড গঠনের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও আন্দোলনকারীরা সড়ক ছাড়ছিলেন না। আন্দোলনের মধ্যে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র ঢুকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে বলে পুলিশের ধারণা।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে নাশকতার চেষ্টা করা হচ্ছিল। আটক ব্যক্তিরা ঢাকার বাইরে থেকে সহিংসতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন বলে পুলিশের দাবি। তাদের মধ্যে কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীর বাসিন্দা রয়েছেন।
এর আগে রোববার সকালে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শ্রমমন্ত্রী নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি আন্দোলনরত শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে সিদ্ধান্তের পর রাজধানী ও গার্মেন্টসপ্রবণ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ হার্ডলাইনে থাকবে বলেও জানা গেছে।


