চাপ ও সংকটে নাজুক হয়ে পড়া তৈরি পোশাক খাত

চাপ ও সংকটে নাজুক হয়ে পড়া তৈরি পোশাক খাত
পোশাকশ্রমিক বিক্ষোভ। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

ঢাকার মিরপুরে হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। টিয়ার গ্যাস, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ একপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও।

ঢাকার মিরপুরে রোববার সকালের  ব্যস্ত নগরজীবন হঠাৎ করেই এক উত্তপ্ত সংঘাতের ময়দানে পরিণত হয়। টিয়ার গ্যাস, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ এবং জ্বলন্ত ধাতব সামগ্রীর ধোঁয়ায় উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস

এদিন সকাল ৯টার দিকে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে মিরপুর-১০ গোলচত্বরে সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। দুপুরের দিকে মিরপুর-১১ এলাকায় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। মুহূর্তেই আকাশ ছেয়ে যায় কালো ধোঁয়ায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

বিক্ষোভের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন। এতে ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী। একই সঙ্গে মিরপুর, কালশী ও প্রশিকা মোড় এলাকায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস

পোড়া গাড়ি আর যানজটে স্থবির হয়ে পড়া সড়কের আড়ালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের দীর্ঘদিনের জীবনসংগ্রাম। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন এই খাতের লাখো শ্রমিক।

অভিজ্ঞ অনেক শ্রমিক দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত কাজ করেও মাসে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করেন। এর মধ্যে বাড়িভাড়া বাবদই চলে যায় আট হাজার টাকা। বাকি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা দিয়ে খাবার, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাতে হয়।

আরও পড়ুন

শ্রমিক নেতাদের দাবি, গত কয়েক বছরে সাধারণ মানের বাসার ভাড়া দুই হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে সাত হাজার ৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ভাড়া বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস

এই দুর্ভোগের অবসানে আন্দোলনে নামেন শ্রমিকেরা। মিরপুরের পাশাপাশি গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিকদের বিক্ষোভ। কোনাবাড়ীতে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের একটি বক্সে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। ব্যাপক অস্থিরতার কারণে কয়েক ডজন পোশাক কারখানা সাময়িক ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ছয় সদস্যের একটি ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে সেই বোর্ডের সভাপতি করা হয়েছে।

আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং দাবি করেন, রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো অস্থিতিশীলতা তৈরিতে উসকানি দিচ্ছে। তবে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সরকারি গেজেটে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস

অন্যদিকে, পোশাক কারখানার মালিকরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কাঁচামালের বাড়তি দাম এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কঠোর মূল্যচাপের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা প্রায়ই ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির বাড়তি ব্যয় নিজেদের ওপর নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া বেশ কঠিন।

বিক্ষোভ চলাকালে দিনভর উত্তেজনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে সড়ক থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয়। বিকালের শেষ দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে মেট্রোরেল ও যানবাহন চলাচল আবার শুরু হয়।

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস

তবে, সড়কে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও শ্রমিকদের অসন্তোষের মূল কারণ এখনো রয়ে গেছে। কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের মূল অর্থনৈতিক সংকট এখনো অমীমাংসিত। একদিকে বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে সেই তুলনায় আয় বাড়ছে না। ফলে প্রতিদিনের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য তৈরি করতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। স্থবির মজুরি আর লাগামহীন মূল্যস্ফীতির মধ্যকার ব্যবধান কমাতে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পোশাকশ্রমিকদের দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ আবারও রাজপথে বিস্ফোরিত হতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad