নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যার পর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার। প্রভাবশালীরা তাদের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের ছেলে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের ভয় আরও বেড়েছে। পুরো গুরুদাসপুর এলাকায় বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি। হত্যাকাণ্ড নিয়ে দলীয় নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ এমনকি সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন।
শাকিল হত্যায় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর জড়িত থাকার সন্দেহে ক্ষুব্ধ দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। তাদের দাবি, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শপথ নিয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এখন দলীয় নেতাকর্মী হত্যার অভিযোগ উঠছে। তারা সংসদ সদস্যের পদত্যাগ ও হত্যার বিচার দাবি করেছেন।
নিহত শাকিলের বাবা রবিউল মিস্ত্রি বলেন, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা এখন ভীতসন্ত্রস্ত। শাকিলের মতো পরিণতি পরিবারের অন্য কাউকে বরণ করতে হয় কি না, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
তিনি আরও বলেন, ‘চাটা গ্রুপের’ লোকজন তাকে ও তার পরিবারকে হুমকি দিচ্ছেন।
রবিউল মিস্ত্রি বলেন, ‘আমার দুইটা ছেলে। একটাকে হারিয়েছি, আরেকটাকে হারাতে চাই না। আমরা গরিব মানুষ, টাকা-পয়সা নাই। এমনিতেই জ্ঞাতিগোষ্ঠীর জোরও নাই। চাটা গ্রুপের রাসেলের অনেক টাকা। অনেক লোকজন। তারা সবই করতে পারে।’
শাকিলের বোন শাকিলা খাতুন বলেন, ‘আমরা খুবই ভয়ে আছি। আমার ভাইকে হারিয়েছি। সে নীতিবান ছিল, কিন্তু টাকা-পয়সা ছিল না। আত্মসম্মান নিয়ে চলার কারণে তাকে মরতে হলো। শাকিল যখন হাসপাতালে ছিল, তখন আমার স্বামী সব সময় তার পাশে ছিল। তাকে শাকিল সব কথা বলেছে। খুনিদের নাম সে বলে দিতে পারে। সেই আশঙ্কায় খুনিরা যদি তাকে হত্যা করে, সেই ভয় আমাদের মনে।’
শাকিলা আরও বলেন, তার বাবা, আরেক ভাই কিংবা স্বামীর জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কে দেবে? তিনি বলেন, ‘আমরা এখন কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। কে এমপির লোক আর কে সাধারণ মানুষ, তা বুঝতে পারছি না। কথা বলতেও ভয় লাগছে। এ কারণে সাংবাদিকদেরও এড়িয়ে চলতে চাই। কে কী কারণে আমাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলছে, তা নিয়েও সন্দেহ হচ্ছে।’
নাটোর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান বাবলু চৌধুরী বলেন, শাকিল দলীয় কোন্দলের বলি হয়েছেন। দায়িত্বশীল পদে থেকে বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রশাসন কাজ করছে। তারা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামিদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনবে বলে আশা করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার শাকিলের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গুরুদাসপুরে যান ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম। শাকিলের কবর জিয়ারত শেষে তিনি বলেন, শাকিল হত্যায় আমেরিকাপ্রবাসী রাসেলের জড়িত থাকার কথা পুলিশ তাদের জানিয়েছে। সংসদ সদস্যের ছেলেকেও আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
একই দিন শাকিলের বাড়িতে যান সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল। তিনি বলেন, হত্যাকারীরা যত প্রভাবশালীই হোক, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি শাকিলের বাড়িতে গেলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সেখানে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে অবস্থান করেন। সেগুলোতে ‘শাকিল হত্যাকারীদের বিচার চাই’ ও ‘এমপি আব্দুল আজিজের পদত্যাগ চাই’ লেখা ছিল। এ সময় এমপি আজিজের অনুসারীরা ব্যানার-ফেস্টুন ছিনিয়ে নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও প্রতিমন্ত্রী সেখানে গেলেও স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ যাননি। দলীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ছেলের নাম হত্যার ঘটনায় জড়িয়ে পড়ায় জনরোষের আশঙ্কায় তিনি সেখানে যাননি।
এমন পরিস্থিতিতেও এমপির সমর্থকেরা শাকিল হত্যার বিচারের দাবিতে টাঙানো ব্যানার ছিনিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, এ ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, এমপি আজিজের অনুসারীদের নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে কতটা ভীতি রয়েছে।
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, শাকিল হত্যা মামলায় সংসদ সদস্যের ছেলেকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সরকার প্রমাণ করেছে, আইনের শাসন ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তারেক রহমানের সরকার কাউকে ছাড় দেবে না।
নাটোরের সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি আব্দুল রাজ্জাক বলেন, ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের ছেলে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হলে ভুক্তভোগী পরিবারের আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। তবে নিহত শাকিলও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতা ছিলেন। তাই দল নিশ্চয়ই পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।
তাকনিম শিপলু নামে এক বিএনপি সমর্থক বলেন, শুধু শাকিলের পরিবার নয়, পুরো গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলা আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। সংসদ সদস্যের অনুসারীরা এখনো মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। এ পরিস্থিতি বন্ধ হওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম রিয়াজুল হাসান বলেন, হুমকি-ধমকির বিষয়ে পরিবারটি পুলিশকে কিছু জানায়নি। তবে কোনো ধরনের হুমকি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হবে।


