রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরবর্তী ধাপ শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)।
বৃহস্পতিবার ‘স্টেজ-সি’ বা পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর এ অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় ফিজিক্যাল স্টার্টআপ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর এ অনুমতি মিলেছে।
এর ফলে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানো এবং পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া যাবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফল হলে আগামী মাসে গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাসান। তিনি জানান, বায়েরা চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান প্রথম ইউনিটের পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর অনুমতি দিয়েছেন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন বায়রার কাছে জমা দেওয়ার পর স্টেজ-সি পর্যায়ের অনুমোদন পাওয়া যায়। এ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী সংস্থাকে ট্রায়াল অপারেশনাল অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।
পাওয়ার স্টার্টআপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কুল্যান্ট ব্যবস্থা, টারবাইন-জেনারেটর, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। এসব ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে কি না, তাও যাচাই করা হবে।
জাহেদুল হাসান জানান, এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে টারবাইনের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা, জেনারেটর এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পরীক্ষা করা হবে। এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য কেন্দ্রটির নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করা।
পুরো প্রক্রিয়ায় বায়েরা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থা এবং নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুরুতে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা কম রেখে পরীক্ষা চালানো হবে। পরীক্ষার ফলাফল ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতা বাড়ানো হবে। রিঅ্যাক্টরের তাপীয় ক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফল হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে এ সময়সীমা নির্ভর করবে পরীক্ষার ফলাফল, কমিশনিং কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণের ওপর।
স্টেজ-সি পর্যায়ের পরীক্ষা, গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু পৃথক ধাপ। বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা, কমিশনিং কার্যক্রম এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব শর্ত পূরণ করতে হবে। তাই পাওয়ার স্টার্টআপের অনুমোদন পাওয়ার অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়া নয়। পরীক্ষামূলক সরবরাহ শুরুর পরও কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই চলবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
কেন্দ্রটি চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও পারমাণবিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হবে।
রূপপুর কেন্দ্রটি থ্রি প্লাস জেনারেশন প্রযুক্তিতে নির্মিত হচ্ছে। নকশা অনুযায়ী, কেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল ৬০ বছর।
প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি ও অন্যান্য আর্থিক কারণে ব্যয় বেড়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য জানায়। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।


