স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পেছানোর প্রস্তাব বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তোলা হচ্ছে। এই প্রস্তাব পাস হলে বাংলাদেশ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সুবিধাগুলো ধরে রাখতে পারবে।
বাংলাদেশ ও নেপালের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর এই প্রস্তাবটি ৭৭টি দেশ ও চীনের পক্ষে জাতিসংঘে পেশ করবে উরুগুয়ে।
জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এবং ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিলের (ইকোসক) সুপারিশ অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন সাধারণ পরিষদের সদস্য দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট প্রয়োজন, যা আগামী ২৪ নভেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত হওয়ার কথা।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাসরুর রিয়াজ সিডিপি ও ইকোসকের এই সুপারিশকে বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
টাইমসকে তিনি বলেন, এখন আসল চ্যালেঞ্জ হলো সাধারণ পরিষদে পর্যাপ্ত ভোট বা সমর্থন নিশ্চিত করা।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন আদায় করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা নেওয়া বিএনপি সরকার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক ধাক্কা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সময় পেতেই এই মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছিল।
খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বাণিজ্যের গতি ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা ও অনিশ্চয়তা তো রয়েছেই।
এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টিও স্বীকৃতি পেয়েছে। যদিও সাধারণত রাজনৈতিক পরিবর্তন উত্তরণের সময় বাড়ানোর কোনো কারণ হয় না, তবুও সিডিপি বাংলাদেশের বর্তমান বিশেষ পরিস্থিতিকে বিবেচনা করেছে।
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা এবং কিছু সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা পায়। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হলে এসব সুবিধা হারাতে হবে। তবে উত্তরণের জন্য বাড়তি সময় পেলে বাংলাদেশ তার বাণিজ্য সুবিধাগুলো হারানোর প্রস্তুতি নিতে আরও সুযোগ পাবে।
তবে অংশীদার দেশ ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর নিজস্ব নিয়মকানুনের ওপর নির্ভর করবে এই সুবিধাগুলোর মেয়াদ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারের বড় ঝুঁকি
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যেখানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় অর্ধেক রপ্তানি হয়।
বর্তমানে এলডিসি সুবিধার কারণে ইইউ বাজারে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়। বিকল্প কোনো বাণিজ্য চুক্তি বা সুবিধা না থাকলে, ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে উত্তরণ ঘটলে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশি পণ্যে বড় ধরনের (দুই অঙ্কের) শুল্ক বসতে পারে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা জিএসপি প্লাস সুবিধা না পেলে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিতে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হতে পারে।
এদিকে, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করছে, যা বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতায় বড় আকারে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি করছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর ধারণা অনুযায়ী, এ বছর উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশ তার বার্ষিক রপ্তানির ১১ শতাংশ হারাতে পারে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়া এবং খাদ্যপণ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, শুল্ক বাড়লে রপ্তানিকারকরা চরম বিপাকে পড়বেন।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, রপ্তানি প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে উত্তরণের মেয়াদ বাড়ানো জরুরি। তবে এই বাড়তি সময় তখনই কাজে লাগবে যখন বাংলাদেশ যথাযথ প্রস্তুতি নেবে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও একই সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, সময় বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজারের সুবিধা নিশ্চিত হয়ে যায় না।
তিনি টাইমসকে জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বড় বড় বাজারের সঙ্গে কার্যকর বাণিজ্য চুক্তি বা দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা না করতে পারলে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশকে উচ্চ শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে।
ওষুধ ও অন্যান্য খাতের ঝুঁকি
এই ঝুঁকি শুধু রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে এলডিসি সুবিধার কারণে দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারকরা রয়্যালটি না দিয়েই নির্দিষ্ট কিছু পেটেন্ট ওষুধ তৈরি করতে পারেন। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটলে এই মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা আর থাকবে না। ফলে ওষুধের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।
পাশাপাশি, বিশ্বব্যাংকের মতো বড় সংস্থার কাছ থেকে সহজ শর্তে উন্নয়ন ঋণ পাওয়ার সুযোগও কমে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনীতি ও ঋণের বোঝার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান
অবশ্য অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক মানদণ্ডে এলডিসি তালিকাভুক্ত থাকে, তার নিচে নেমে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই।
উত্তরণের মানদণ্ড ৬৬-এর বিপরীতে বাংলাদেশের মানব সম্পদ সূচক ছিল ৭৭ দশমিক ৫। উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই সূচক ৮৮।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচকে উত্তরণের মানদণ্ড ৩২-এর বিপরীতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২১ দশমিক ৯। এই সূচকে স্কোর যত কম তত ভালো।
জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের এই সূচকগুলোর নিচে নেমে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সময় বাড়ানোর সুযোগে সংস্কারে দেরি না করে বরং দেশের প্রতিযোগিতাসক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে হবে।
অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর জোর
সিডিপির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই অতিরিক্ত সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারই হবে মূল কাজ। এতে বাংলাদেশকে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি আনতে এবং জাতীয় উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
সরকারকে নিয়মিত সিডিপিকে সংস্কারের অগ্রগতি জানাতে হবে এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, সুচারু উত্তরণ কৌশলে সঠিক বিষয়গুলো থাকলেও অনেক পদক্ষেপই পুরোপুরি বাস্তবসম্মত বা কার্যোপযোগী নয়।
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, ‘পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই আমরা উত্তরণের দিকে চলে এসেছি’।
তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দেশের শিল্প খাতকে শক্তিশালী করা, মুক্ত বাণিজ্য আলোচনার প্রস্তুতি এবং দ্রুত সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে হলে আমাদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।’
নেপালের পরিস্থিতি
নেপালের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স ও পর্যটনে অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ধাক্কা এবং কঠিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবেশের কথা বলা হয়েছে।
নেপাল যদি তাদের উত্তরণ কৌশল সংশোধনের জন্য একটি স্পষ্ট ও সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করে, তবেই মেয়াদ বৃদ্ধি যথাযথ হবে বলে মনে করে সিডিপি।
উভয় দেশকেই নিয়মিত অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধিরা স্থানীয়ভাবে এটি তদারকি করবেন।
প্রস্তাবে উভয় দেশের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিকভাবে সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, উন্নয়ন কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন না ঘটিয়ে এই উত্তরণ যেন স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় হয়।
সাধারণ পরিষদের বৃহস্পতিবারের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে দেশ দুটি বাড়তি প্রস্তুতি সময় পাবে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যদি এই সময় পায়, তবে আসল কাজ হবে এই সময়কে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য চুক্তি করা, শিল্প খাতকে শক্তিশালী করা এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী সংস্কার নিশ্চিত করা।
জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা ২০১৮ সাল থেকে প্রস্তুতি নিয়ে কেবল কথাই বলে যাচ্ছি। এখন সত্যিকারের প্রতিশ্রুতি ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।’


