মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর শূন্য হওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপিকে হারিয়ে জামায়াত কি চমক দেখাতে পারবে–এই প্রশ্ন উত্তরের এই জনপদ ছাড়িয়ে রাজনীতিতে আগ্রহীদের মনে পৌঁছে গেছে।
নবগঠিত রুহিয়া ও ভুল্লী এবং সদর উপজেলার ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে।
বিএনপির শাসনের আট মাসের মাথায় এই নির্বাচন সরকারের জনপ্রিয়তা প্রমাণের পরীক্ষা যেমন, তেমনি রাষ্ট্রপতির এলাকা বলে সম্মান রক্ষার চেষ্টায় নেতাকর্মীরা। অপরদিকে জয় পেতে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীরা।
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আরও তিনজন প্রার্থী আছেন, তারা হলেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।
বিএনপি এখানে প্রার্থী করেছে রাষ্ট্রপতির ছোটো ভাই মির্জা ফয়সল আমীনকে, জামায়াত প্রতীক দিয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ফখরুলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মো. দেলাওয়ার হোসেনকে।
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্যও এটি পরীক্ষা। বিএনপি সরকারে আসার পর বগুড়া-৬ আসনে উপনির্বাচন এবং শেরপুর-৩ আসনে স্থগিত হওয়া নির্বাচনে জামায়াত হেরে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল। তবে সেই নির্বাচন সেভাবে আলোচিত হয়নি, ফখরুলের কারণেই এই নির্বাচনের দিকে আছে দৃষ্টি।
ভোটের প্রচারে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্ট আক্রমণ করলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। বুধবার রাত পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতাও দেখা গেছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ করতে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও নিজস্ব পর্যবেক্ষক দিয়ে মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ইসিতে আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং সেল খোলা হয়েছে।’
১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে এ আসনে মির্জা ফখরুল প্রায় ৯৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থীকে হারিয়ে জয় পান। ফখরুল ইসলাম পান দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট আর দেলাওয়ার পান এক লাখ ৪১ হাজার ১৭।
গত ২১ আগস্ট রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী, শূন্য ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ছেড়ে দেওয়া আসন বিবেচনায় স্পর্শকাতর এ নির্বাচনে সবকটি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে বাড়তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকায় তিন হাজারের কাছাকাছি পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি, আনসার সদস্যের পাশাপাশি নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও মাঠে রয়েছেন।
আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৩ জন। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় ৩ লাখ ২৭ হাজার ৬৭৭ জন, রুহিয়াতে ৮২ হাজার ৬৫৮ ও ভূল্লী উপজেলায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫১৮জন।
নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিন হাজার ১৫২জন, তাদের প্রায় সবাই সরকারি কর্মকর্তা।
পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ
ভোটগ্রহণের আগের দিন বুধবার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন বিএনপি ও জামায়াত নেতারা।
সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার অভিযোগ করেন, টাকা বিতরণ ও বিভিন্ন সরকারি সুবিধার কার্ড দেওয়ার আশ্বাসের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে বিএনপি।
তার দাবি, ভোটার স্লিপ বিতরণের সময় সরকারদলীয় প্রার্থীর কর্মীরা ভোটারদের ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে দিচ্ছেন। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং বয়স্ক ও বিধবা ভাতার কার্ড দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনি কাজে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে দেলাওয়ার জানান, এসব বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিচারিক তদন্ত কমিটির কাছে অভিযোগ করেছেন। তবে অভিযোগের পরও কার্যকর প্রতিকার পাননি।
নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও জনগণের আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
জামায়াত প্রার্থীর সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীনের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনি পরিবেশ ভালো আছে। কোনো শঙ্কা নেই। বিএনপি কাউকে প্রভাবিত করছে না।’
তার দাবি, পরাজয় টের পেয়ে জামায়াত মিথ্যাচার করছে। ‘জামায়াতের প্রার্থী অনেক এলাকায় প্রচার চালাতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। ওই দায়ও বিএনপির চাপানোর চেষ্টা করছে। আমরা জনগণের রায়ে বিশ্বাসী, জনগণ যাকে ভোট দেবে তিনিই নির্বাচিত হবেন’, বিএনপি নেতা বলেন।
‘সরকার ও ইসির জন্য পরীক্ষা’
এ নির্বাচনকে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখছে ইসলামী আন্দোলন।
বুধবার এক বিবৃতিতে দলটির যুগ্ম মহাসচিব শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, ‘এই নির্বাচন সরকারের জন্য লিটমাস টেস্ট হতে যাচ্ছে।’
তার মতে, এ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বোঝা যাবে বর্তমান সরকারের অধীনে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।
ভোটে শক্তি প্রয়োগ, জালিয়াতি কিংবা ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টা হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
কেন্দ্রে পৌঁছেছে সরঞ্জাম
বুধবার সকাল থেকে কড়া নিরাপত্তায় ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে নির্বাচনি সরঞ্জাম। সকাল ১০টার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠ থেকে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের কাছে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ হস্তান্তর করা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তায় সেগুলো কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
উপনির্বাচনের পরিবেশ ভালো রয়েছে বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হবে। এখন পর্যন্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো কারণ আমরা পাইনি এবং ইনশাল্লাহ পাবও না।’
নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নির্বাচন কমিশন ভবনে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, এই সেল থেকে ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটের সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকি করা হবে।


