বিশ্ব স্ট্রোক দিবস/ জেলাগুলোতে নেই চিকিৎসা, ঢাকার হাসপাতালে বেড সংকট

জেলাগুলোতে নেই চিকিৎসা, ঢাকার হাসপাতালে বেড সংকট
Advertisement
Advertisement

জামালপুরের স্ট্রোক রোগী ওমর আলী। পাঁচ দিন ধরে চারটা হাসপাতালে ঘুরেও ঢাকায় একটা বেডের ব্যবস্থা করতে পারছেন না তার পরিবারের লোকজন। নিজ জেলার দুইটা হাসপাতালে ভালো চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় তারা ফিরিয়ে দিয়েছিল। আর ঢাকার এক বেসরকারি হাসপাতাল তাকে এমন এক সরকারি হাসপাতালে পাঠায়, যেখানে কোনো বেডই খালি ছিল না।

ওমর আলীর এই কষ্ট দেশে স্ট্রোক চিকিৎসার আসল চিত্র তুলে ধরে। ঢাকার বাইরে ভালো চিকিৎসার অভাব, স্পেশালিস্ট হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড় আর জরুরি চিকিৎসায় দেরি হওয়ার কারণে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন। আর যারা বেঁচে থাকছেন তারা পঙ্গু হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

পাবমেড সেন্ট্রালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৬৮ জন মানুষ স্ট্রোকে মারা যান। চিকিৎসকরা বলেন, অনেক রোগী সময়মতো ভালো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না বলেই সঠিক সময়ে জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ হারান।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘুরে আসার পর ওমর আলীকে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চার দিন পর সেখানকার ডাক্তাররা পরিবারকে তাকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

তার আত্মীয় বিউটি বেগম বুধবার সকালে সেই স্পেশালিস্ট হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তাকে বলা হয়, রোগীকে না আনলে ভর্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এ ছাড়া আগের হাসপাতাল থেকে একটি মেডিকেল সামারি বা চিকিৎসার কাগজও নিয়ে আসতে বলা হয়।

কাগজপত্র জোগাড় করে ওমরকে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে আসেন বিউটি। একজন ডাক্তার রোগী দেখে বলেন, তাকে এখনই ভর্তি করতে হবে। কিন্তু হাসপাতালে একটি বেডও খালি নেই। সেখানে আগে থেকেই ১৫ জনের বেশি রোগী অপেক্ষমাণ ছিলেন।

এরপর পরিবারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, যেখানে অনেক সময় রোগীকে ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ওমরের শরীরের বাম পাশ এখন একদম অবশ। তিনি এখনো অচেতন, নল দিয়ে তাকে তরল খাবার দেওয়া হয়। পাশাপাশি দিতে হয় অক্সিজেন। ডাক্তার জানিয়েছেন, তার অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে এবং আইসিইউ লাগতে পারে।

স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রোগ হওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করতে না পারলে বেঁচে থাকার এবং সুস্থ হওয়ার আশা দ্রুত কমে যায়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম টাইমসকে জানান, যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করা যায় রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তত বাড়ে।

ইশেমিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে মস্তিষ্কের কোষগুলো অক্সিজেন পায় না। এর একটি ভালো চিকিৎসা হলো ইন্ট্রাভেনাস থ্রম্বোলাইসিস, যেখানে রক্ত জমাট বাঁধার ওষুধ দিয়ে তা গলিয়ে ফেলা হয়। তবে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর উপযুক্ত রোগীদের জন্যই এই চিকিৎসা প্রযোজ্য।

ডা. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘যে রোগীরা সঠিক সময়ে হাসপাতালে আসেন এবং এই চিকিৎসার উপযুক্ত হন, তারা তা পান। কিন্তু অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান। আবার অনেকে অনেক দেরিতে আসার কারণে যথাযথ চিকিৎসার সুযোগ পান না।’

আরও পড়ুন

তিনি আরও বলেন, সারা দেশেই এই চিকিৎসা ছড়িয়ে দিতে পারলে স্ট্রোকের কারণে মানুষের স্থায়ী পঙ্গুত্ব কমানো সম্ভব হবে।

৫০০ বেড তালাবদ্ধ, রোগীরা বাইরে

রাজধানীতে থেকেও মানুষ বেডের অভাবে ভালো চিকিৎসা পাচ্ছে না। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার রোগী আসেন, যাদের অনেকেরই ভর্তি হওয়া দরকার।

ডা. মাজহারুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন ভর্তি হওয়ার মতো রোগী আসেন ৪০০ থেকে ৪৫০ জন, কিন্তু হাসপাতাল মাত্র ৫০ জনের মতো রোগীকে জায়গা দিতে পারে।

নতুন আরেকটি ভবন তৈরি আছে যাতে আরও ৫০০ বেড ও সব আধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চতুর্থ শ্রেণির লোকবল বা সহায়ক কর্মী নিয়োগ বন্ধ থাকায় ভবনটি পুরোপুরি চালু করা যাচ্ছে না।

ভবনটির বহির্বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, এমআরআই এবং সিটি স্ক্যান আংশিকভাবে চালু থাকলেও পুরো সেবা মিলছে না।

কেন কর্মী নিয়োগ আটকে আছে সে বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল উইংয়ের সহকারী পরিচালক আহসানুল হক টাইমসকে জানান, ওই পদগুলোতে নিয়োগ এখন বন্ধ আছে। কবে নাগাদ আবার চালু হবে, তা তিনি বলতে পারেননি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন টাইমসকে বলেন, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি একটু স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়, তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়ানো যায়।

তিনি বলেন, ‘সব সিদ্ধান্ত যদি মন্ত্রণালয় থেকে নিতে হয়, তবে কাজ তো দেরি হবেই।’

চিকিৎসকরা জানান, নানা জটিলতার কারণে আটটি বিভাগীয় শহরে নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনাও আটকে আছে। এই হাসপাতালগুলো চালু হলে ঢাকার ওপর চাপ কমত, জেলার রোগীরা সহজেই কাছাকাছি জায়গায় বিশেষায়িত চিকিৎসা পেতেন।

ডা. মুশতাক বলেন, শুধু ঢাকায় বড় বড় হাসপাতাল বানিয়ে এই সংকট দূর করা যাবে না। জেলার হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, বিভাগীয় শহরগুলোতে জটিল রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি শুধু যন্ত্রপাতি কেনার পেছনে না ছুটে রক্তচাপ মাপা ও স্ট্রোক প্রতিরোধের বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন।

অবহেলিত প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন

পাবমেড সেন্ট্রালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৬৬ জন মানুষ স্ট্রোকে মারা যান। এই হিসাবে প্রতিদিন মারা যান প্রায় ৩৬৮ জন। এ ছাড়া আরও অসংখ্য মানুষ আংশিক বা পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

চিকিৎসকদের মতে, কায়িক পরিশ্রম না করা, অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ হলো স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং সময়মতো উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হওয়া খুব জরুরি।

স্ট্রোকের পর বেঁচে যাওয়া মানুষেরাও ঠিকমতো ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন সেবা পান না। এ কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

উপযুক্ত রোগীদের জন্য থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে ও পক্ষাঘাত কমাতে দারুণ কাজ করে, কিন্তু এটি বেশ খরচসাপেক্ষ। সরকার থেকে সাহায্য না পেলে সাধারণ পরিবারের পক্ষে এই খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

চিকিৎসকদের পরিষ্কার কথা–ঢাকার বাইরে জরুরি স্ট্রোক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বন্ধ থাকা বেডগুলো দ্রুত চালু করা এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করা গেলে বহু মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব এবং পঙ্গুত্ব কমানো সম্ভব।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad