নারায়ণগঞ্জ সাইলোতে কোটি টাকার গম চুরি

নারায়ণগঞ্জ সাইলোতে কোটি টাকার গম চুরি
কার্টুন/টাইমস
Advertisement
Advertisement

দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ সাইলো (শস্যভাণ্ডার) থেকে গম চুরি করে আসছে ঠিকাদার ও সরকারি কর্মকর্তাদের একটি পুরনো চক্র। এর ফলে কোটি কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে দেশ। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে বিদেশ থেকে আনা এই খাদ্যশস্য সাইলোর বেশ কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহায়তায় চুরি হচ্ছে।

দেশের তৃতীয় বৃহত্তম এই সাইলোর ভেতরের সূত্র ও নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ওজন মাপার মেশিন এবং সিসিটিভি ক্যামেরায় কারসাজি করে নিয়মিত এই চুরি করা হয়। কিন্তু সাইলোর কর্মকর্তারাই এর সঙ্গে জড়িত থাকায় বিষয়টি গোপন থাকে।

তবে এবারের সর্বশেষ ২৭০ বস্তা গম চুরি আর ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হয়নি। গত ১৭ অক্টোবর চক্রের সদস্যরা নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত ২৭০ বস্তা গম নিয়ে নেয়, অথচ বস্তা গণনার মিটারে শুধু নিয়মমাফিক ৪ হাজার বস্তার হিসাবই দেখায়।

চক্রের বাইরে থাকা কিছু সাইলো কর্মী সন্দেহবশত ব্যাগিং মেশিনের সিসিটিভি ফুটেজ ভালভাবে পরীক্ষা করে অতিরিক্ত বস্তাগুলো দেখতে পান। এই ২৭০ বস্তা গমের ওজন সাড়ে ১৩ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।

সাইলোর সূত্র জানায়, বিষয়টি সাইলোর সুপারিনটেনডেন্ট মো. রিয়াজুল আলমের দৃষ্টিতে আনা হলেও তিনি কোনো কথা বলেননি। সূত্রগুলোর অভিযোগ, রিয়াজুল এবং দুই ঠিকাদার মো. সোহাগ ও বদরউদ্দিন এই চুরির মূল হোতা।

বদরউদ্দিন নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও সাইলোর কিছু কর্মকর্তার কাছে অতিরিক্ত বস্তাগুলো নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাইলোর একটি সূত্র টাইমসকে বলেন, আমরা প্রমাণসহ ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে চুরির বস্তাগুলো গুদামে ফেরত দিতে রাজি হননি।

রিয়াজুল টাইমসের সঙ্গে কথা বলা এড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে, এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত সোহাগ কোনো ফোন বা মেসেজের জবাব দেননি।

সূত্রগুলো জানায়, সোহাগ ও বদরউদ্দিন দুজনেরই রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে এবং এর জোরেই তারা চুরি করে পার পেয়ে যাচ্ছেন।

চুরির বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর সাইলোর ভেতর হুলস্থুল কাণ্ড বেঁধে যায়। কিন্তু বরাবরের মতো এবারও চক্রের সদস্যরা চুরির দায় দুই অপারেটরের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

যেভাবে চুরি হয়

সাইলো কর্তৃপক্ষের নিজস্ব রেকর্ড ও মনিটরিং ডেটা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ‘এম.বি. আল মিরাজ’ নামের একটি জাহাজে মোট ২০০ মেট্রিক টন বা ৪ হাজার বস্তা গম পাঠানোর চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৬৫ মেট্রিক টন বা ৩ হাজার ৩০০ বস্তা বদরউদ্দিনের ‘এম/এস বাবা এনায়েতপুরী (রহ.) এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে এবং ৩৫ মেট্রিক টন বা ৭০০ বস্তা তার আরেক প্রতিষ্ঠান ‘এম/এস দোয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে বরাদ্দ ছিল।

গত ১৭ অক্টোবর সকাল সোয়া দশটা থেকে বিকাল পৌনে ছয়টার মধ্যে সাইলোর ব্যাগিং মেশিনের মাধ্যমে জাহাজে গম লোড করা হয়।

লোডিং শেষ হওয়ার পর হিসাব রাখার দায়িত্বে থাকা মনিটরিং কর্মকর্তারা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গড়মিল দেখতে পান। ব্যাগ কাউন্টার মিটারে ৪ হাজার বস্তা দেখালেও বাস্তবে জাহাজে অতিরিক্ত আরও ২৭০ বস্তা লোড করা হয়।

আরও পড়ুন

এই অনিয়ম বুঝতে পেরে তারা সঙ্গে সঙ্গে সুপারিনটেনডেন্ট ও ঠিকাদারকে জানান। প্রথমে তারা বদরউদ্দিনকে জানালে তিনি অতিরিক্ত গম নেওয়ার কথা স্বীকার করেন, কিন্তু সরকারি গুদামে তা ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। এরপর বিষয়টি সুপারিনটেনডেন্ট রিয়াজুলের নজরে আনা হলেও তিনি কোনো আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেননি।

গত ২৫ অক্টোবর সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আদনান আসিফ কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে দুই অপারেটরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।

ওইদিন ব্যাগিং হাউসের দায়িত্বে থাকা মো. আব্দুল মালেক এবং নৌকা লোডিংয়ের দায়িত্বে থাকা মো. দুলালকে কীভাবে জাহাজে অতিরিক্ত বস্তাগুলো লোড হলো ১০ দিনের মধ্যে এর জবাব দিতে বলা হয়েছে।

সূত্রগুলোর মতে, আসল দোষীদের বাঁচাতেই এই নাটক সাজানো হয়।

সাইলো ও খাদ্য অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, ছোট-বড় নানা উপায়ে নিয়মিত গম চুরি হচ্ছে। কিন্তু ঠিকাদার বদরউদ্দিন ও সোহাগের সঙ্গে সাইলোর অনেক কর্মকর্তা জড়িত থাকায় এসব চুরির খবর চাপা পড়ে থাকে।

২০১৮ সালের একটি তদন্ত প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, নারায়ণগঞ্জ সাইলো থেকে প্রতি বছরই গম চুরি হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চরম অবহেলার কারণে সেই চুরি যাওয়া গম কোনো হিসাবের খাতাতেই তোলা হতো না।

আসল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে

সাইলোর রেকর্ডপত্র বলছে, ঘটনার আসল মাস্টারমাইন্ডদের কখনো ধরা হয় না। ২০১৮ সালে এই চক্র বিক্রির উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জ সাইলোতে ১ হাজার ১১ মেট্রিক টন গম জমিয়ে রেখেছিল। খাদ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ দেখতে পায়, বিপুল পরিমাণ এই গম সরকারি হিসাব থেকে গায়েব। চক্রটি সরকারি হিসাবে না দেখিয়েই গম বিক্রি করে দিয়েছিল, তবে ধরা পড়ার পর তা সাইলোর বাইরে নিতে পারেনি।

সাইলোর একাধিক সূত্র দাবি করে, সেই চুরির চেষ্টার পেছনেও এই একই তিনজন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। কিন্তু সেবারও তাদের নাম সামনে আসেনি, অন্য লোকেদের বলির পাঁঠা করা হয়েছিল।

খাদ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. আরিফুর রহমান স্বাক্ষরিত ২০১৮ সালের ৩১ মে তারিখের এক চিঠিতে অতিরিক্ত গমের এই ঘটনায় সাইলোর তৎকালীন সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে হপার স্কেলের ইনচার্জ আব্দুল মালেককে প্রধান অভিযুক্ত দেখানো হয়।

এরপর রিয়াজুলকে পোস্তগোলায় সরকারি মডার্ন ফ্লাওয়ার মিলে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে তিনি ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আবার নারায়ণগঞ্জ সাইলোতে সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে ফিরে আসেন। আর তার ফেরার পরেই পুরনো এই সিন্ডিকেট খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে জানান সাইলোর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অপারেটর।

বদরউদ্দিন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকা বা মেশিনে কারসাজি করে গম চুরির কথা অস্বীকার করেন। তার দাবি তিনি সাইলোতে যাননি। অথচ সাইলোর সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, শীতলক্ষ্যার তীরে সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত সাইলোর পাশেই তার বাড়ি হওয়ায় তিনি নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করেন।

সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের পর থেকে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত আছেন বদরউদ্দিন। গত বছর রিয়াজুল ফিরে আসার পর তিনি এবং সোহাগ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে ২৬ অক্টোবর সুপারিনটেনডেন্ট রিয়াজুলকে ফোন করা হলে তিনি মিটিং-এ ব্যস্ত আছেন বলে জানান। মিটিং শেষে কলব্যাক করার কথা জানালেও তিনি আর কল করেননি।

পরের দিন টাইমস পুনরায় তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি ফোন ধরেননি। তবে তার পক্ষে তানভীর আদনান আসিফ কল ব্যাক করে জানান, সুপারিনটেনডেন্ট রিয়াজুল টাইমসের প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলবেন না।

শোকজ নোটিশ দেওয়া কর্মকর্তা তানভীর স্বীকার করেন, সাইলোতে অতিরিক্ত বস্তার বিষয়টি তার জানা ছিল।

এখন বিভিন্ন সাইলো এবং খাদ্য অধিদপ্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ২৭০ বস্তা গম চুরির এই ঘটনা। কিন্তু দেশের সব সাইলোর দেখভালের দায়িত্বে থাকা খাদ্য অধিদপ্তরের মুভমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড সাইলো বিভাগের পরিচালক মো. আবদুস সালাম দাবি করেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘২০১৮ সালে কী ঘটেছিল কিংবা নারায়ণগঞ্জ সাইলোতে কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় আছে কি না, সে বিষয়েও আমার কিছু জানা নেই।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad