১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম ১৩৯ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা করার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি। তবে আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা কমিশন আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা ও বিইআরসির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গণশুনানিতে অংশগ্রহণকারীরা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিআইএএম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে এলপিজির দাম ও বাজারজাতকরণ ব্যয় পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে এসব প্রস্তাব ও অভিযোগ উঠে আসে।
কারিগরি কমিটি অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৩ টাকা ৮৮ পয়সা করার সুপারিশ করেছে। এতে লিটারপ্রতি দাম বাড়বে ৯ টাকা ২৬ পয়সা।
এর আগে ৪ অক্টোবর ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল বিইআরসি। তবে গণশুনানিতে অভিযোগ করা হয়, বাজারে নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তাদের সিলিন্ডারপ্রতি ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
দাম পুনর্নির্ধারণের পাশাপাশি এলপিজির সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ ও বিপণন ব্যয় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে কারিগরি কমিটি। বেসরকারি অপারেটরদের প্রতি কেজি এলপিজির সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ১২ কেজির সিলিন্ডারে পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি কমিশন দাবি করেছে। শুনানিতে ওমেরা ১২ কেজির সিলিন্ডারে ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা কমিশন প্রস্তাব করেছে। শুনানিতে জানানো হয়, বর্তমানে এ খাতে কমিশন ২০০ টাকা।
পরিবেশকেরা তাদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। খুচরা বিক্রেতারা কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা এবং অটোগ্যাস স্টেশন মালিকেরা লিটারপ্রতি কমিশন ৮ টাকা থেকে ১১ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান মূল্যকাঠামোয় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে জাহাজভাড়াসহ প্রিমিয়াম ছিল টনপ্রতি ৮০ থেকে ১২০ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি এমনভাবে দাম নির্ধারণের আহ্বান জানান, যাতে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি না হয়।
তবে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি ও কমিশনের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন গণশুনানিতে অংশ নেওয়া সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব দেখে মনে হচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরান যুদ্ধের পুরো ব্যয় বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে।
গত ডিসেম্বরে ১২ কেজির সিলিন্ডার আড়াই হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে কেন, তারও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সিরাজুল ইসলামের দাবি, ঢাকায় এখন ২ হাজার ২০০ টাকার নিচে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। দাম বাড়ার আশায় কোম্পানিগুলো গ্যাস আটকে রাখলেও বিইআরসি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে কমিশন বৃদ্ধির দাবিতে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর ১৪ অক্টোবর কর্মসূচি প্রত্যাহার করে সংগঠনটি।
একই দিন বিইআরসি গণশুনানির ঘোষণা দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে শুনানির আয়োজন করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও ওঠে।
গণশুনানিতে কারিগরি কমিটির সুপারিশের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও অন্য অংশীজনদের বক্তব্য বিবেচনা করবে বিইআরসি। কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর নতুন দাম এবং তা কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করা হবে।
তার আগে ১২ কেজির সিলিন্ডারের প্রস্তাবিত ১ হাজার ৯৭৬ টাকা কার্যকর মূল্য হিসেবে গণ্য হবে না।


