কলেজের ক্লাস করে বিকালে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালন, কখনো রাতভর বন্দরে পাহারা দিয়ে সকালে ছুটতেন কলেজে। সেই নয়ন এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী।
দিনে কলেজের ক্লাস, বিকালে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব, আবার কোনো দিন রাতভর বন্দরে পাহারা দিয়ে সকালে ছুটতেন কলেজে। ঘুম ও বিশ্রামের চেয়ে তখন তার কাছে বড় ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার তাগিদ। কলেজের বেতন, বই, কোচিং ফি ও যাতায়াতের খরচ মেটাতে বেছে নিতে হয়েছিল নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি। সেই চাকরি করে জমিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির টাকা। শেষ পর্যন্ত সুযোগ পেয়েছেন স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে সেখানে ভর্তি হওয়ার খরচ জোগাতে নিজের সোনার চেইন বিক্রি করতে হয়েছে তার মাকেও।
বলছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মাসুদুর রহমান নয়নের কথা। যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোলের এই তরুণ একসময় শুনেছেন ‘দারোয়ান’ বলে উপহাস। মানুষের তাচ্ছিল্য ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা কোনোটি তাকে থামাতে পারেনি। প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে গেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে। একসময় যিনি পড়াশোনার খরচ জোগাতে রাতভর নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
ল্যাপটপ বিক্রি করে কলেজে ভর্তি
নয়নের সংগ্রাম শুরু উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠার আগেই। এসএসসি পরীক্ষার পর কলেজে ভর্তি হওয়ার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। অথচ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল তার। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে অনলাইনে বিভিন্ন কাজ করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে কিনেছিলেন একটি ল্যাপটপ। কলেজে ভর্তির প্রয়োজন দেখা দিলে নিজের জমানো টাকায় কেনা ল্যাপটপটি বিক্রি করে দেন।
সেই টাকা দিয়ে কলেজের ভর্তি ফি পরিশোধ করেন, বই কেনেন ও পোশাক তৈরি করেন। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ দিন কলেজে যাওয়ার পর সামনে আসে নতুন সংকট। প্রতিদিন যাতায়াতের ভাড়া লাগত ৫০ টাকা। পরিবারের পক্ষে নিয়মিত এই খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন সিদ্ধান্ত নেন, নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেকেই জোগাতে হবে।
নয়ন বলেন, ‘পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ খোঁজা শুরু করি। পরে বাবা ও ভাইদের সহযোগিতায় ২০২৩ সালের শুরুর দিকে বেনাপোল স্থলবন্দরে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি নিই।’
রাতভর দায়িত্ব, সকালে কলেজ
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর নয়নের জীবন যেন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে শুরু করে। বন্দরে তিনটি শিফটের মধ্যে তিনি নিয়মিত দুটি শিফটে দায়িত্ব পালন করতেন। বিকাল ৩টা থেকে রাত ১১টা এবং রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কাজ করতেন কলেজে উপস্থিত থাকার সুযোগ করে নিতে।
বিকালের শিফট থাকলে সকাল ৭টার দিকে কলেজে যেতেন। দুপুর আড়াইটায় ক্লাস শেষ করে সরাসরি কাজে যোগ দিতেন। কাজ শেষে রাত ১২টার দিকে বাড়ি ফিরতেন। আবার রাতের শিফট থাকলে রাত ১০টার দিকে বাড়ি থেকে বের হতেন। সকাল ৭টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে সেখান থেকে চলে যেতেন কলেজে। ক্লাস শেষে বিকালে ফিরতেন বাড়িতে।
এভাবেই পড়াশোনা ও চাকরি একসঙ্গে চালিয়ে গেছেন তিনি। উপার্জিত অর্থ দিয়ে কলেজের ফি, কোচিংয়ের বেতন ও যাতায়াতের খরচ মেটাতেন। নিজের উপার্জনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার এই চেষ্টাই ছিল উচ্চশিক্ষার পথে টিকে থাকার লড়াই।
‘দারোয়ান আসতেছে, সাইড দে’
নিরাপত্তাকর্মীর পোশাক গায়ে জড়ানোর পাশাপাশি নয়নকে সহ্য করতে হয়েছে মানুষের অবজ্ঞা। কলেজে যাওয়ার সময় কেউ কেউ তাকে ভিন্ন চোখে দেখতেন। কারও কাছ থেকে পেয়েছেন উৎসাহ, আবার কারও কথায় ছিল তাচ্ছিল্য।
নয়ন জানান, কেউ কেউ তাকে দেখে বলতেন, ‘দারোয়ান আসতেছে, সাইড দে।’ বন্দরের আবাসিক এলাকায় দায়িত্ব পালন করার সময়ও কখনো কখনো তাকে হেয় করে কথা বলা হতো। এসব আচরণে কষ্ট পেলেও সেগুলোকে নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার কারণ হতে দেননি।
নয়ন বলেন, ‘আমার কিছু বন্ধু ছিল, যারা বলত, “কাজ করছিস, তুই তো আর চুরি-ডাকাতি করছিস না।” আবার অনেকে দারোয়ান বলে উপহাস করত। কথাগুলো খারাপ লাগত, কিন্তু আমি এড়িয়ে যেতাম। এগুলো মাথায় নিলে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারতাম না। তাই সবকিছু উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে গেছি।’
নয়নের কাছে এই পেশাটি ছিল নিজের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার উপায়। মানুষের কথার জবাব কথায় নয়, নিজের অবস্থান বদলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দিতে চেয়েছেন তিনি।
যেভাবে জন্ম নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন
কলেজে ভর্তি হওয়ার পরপরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন স্পষ্ট ছিল না নয়নের। বন্দরে চাকরি করার সময় একটি সংগঠনের কাজে আসা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তাদের সঙ্গে কথা বলার পর উচ্চশিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায় তাকে।
তখনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, তাকেও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। শুরু করেন ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য টাকা জমানো। প্রায় এক বছর আট মাস থেকে দুই বছর চাকরি করার পর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে যশোরের প্যারাগন অ্যাডমিশন সেন্টারে ভর্তি হন।
সেখানে প্রায় সাত থেকে আট মাস থেকে নিজের জমানো টাকা দিয়ে কোচিংয়ের ফি ও মেসের খরচ চালিয়েছেন। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় প্রস্তুতির পুরো সময় নিজের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাকে।
অবশেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান নয়ন। তবে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ মিললেও ভর্তি হওয়ার খরচ জোগাড় করা ছিল আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ছেলের স্বপ্ন পূরণে মায়ের গয়না বিক্রি
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় নয়নের জমানো টাকা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ভর্তি, দুই ধাপের খরচ কীভাবে মেটাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। নিজের ফোন বিক্রি করে ভর্তি হওয়ার কথা জানান মাকে।
কিন্তু মা তাকে ফোন বিক্রি করতে নিষেধ করেন। আশ্বাস দেন, টাকার ব্যবস্থা করবেন। কীভাবে সেই অর্থ জোগাড় করবেন, তা নয়নের জানা ছিল না। পরে জানতে পারেন, ভর্তি ও প্রাথমিক খরচের ব্যবস্থা করতে তার মা নিজের সোনার একটি চেইন বিক্রি করে দিয়েছেন।
কলেজের পড়াশোনা ও ভর্তি প্রস্তুতির খরচ নিজে জোগানোর পর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের মুহূর্তেও মায়ের এই ত্যাগ নয়নের জন্য বড় অবলম্বন হয়ে ওঠে। নিজের চেষ্টার পাশাপাশি পরিবারের সহযোগিতাও তাকে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
স্বপ্ন এখন বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়া
বেনাপোল স্থলবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে ওঠার এই পথচলায় নয়নকে একদিকে সামলাতে হয়েছে পড়াশোনার খরচ, অন্যদিকে সহ্য করতে হয়েছে মানুষের উপহাস। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। টিউশনি করে চালাচ্ছেন নিজের থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনার খরচ।
যে তরুণ একসময় নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে রাতভর দায়িত্ব পালন করেছেন, তার চোখে এখন আরও বড় স্বপ্ন। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে চান। নিতে চান তাদের সব দায়িত্ব।
নয়ন বলেন, ‘আমার একটাই লক্ষ্য, বাবা-মায়ের ইচ্ছা পূরণ করা এবং তাদের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজে নেওয়া।’


