হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে নতুন প্রস্তাবের পর যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় থাকা ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোয় নতুন করে হামলার কড়া হুমকি দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে তেহরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। মঙ্গলবার দেওয়া দেশটি এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য আরও কঠোর করেছে। খবর দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের।
তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়ার আশা করছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুপক্ষের সরাসরি সামরিক সংঘাতের মাত্রা কিছুটা কমলেও হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জ্বালানিবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। অন্যদিকে, নতুন করে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর বদলে অর্থনৈতিক চাপ জোরদার করার নীতিতে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ নতুন করে সর্বাত্মক হামলার হুমকি দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিওবার্তায় গালিবাফ বলেন, ‘যে অঞ্চলে আমরা তেল বিক্রি করতে পারব না, সেখানে অন্য কেউও তেল বিক্রি করতে পারবে না। আর আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো অবকাঠামোই নিরাপদ থাকবে না।’
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালালে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। এর পরপরই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন অবরুদ্ধ করে দেয় তেহরান।
সংঘাত শুরুর আগে সমগ্র বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। অন্যদিকে, ইরান যেন বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি করতে না পারে, সেজন্য সমুদ্রপথে কঠোর অবরোধ বসিয়ে রেখেছে মার্কিন নৌবাহিনী।
সোমবার রাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়া ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানান, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা উভয় পক্ষকে ‘কিছু প্রস্তাব’ দিয়েছেন এবং সেগুলো নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। কাতারি প্রতিনিধিরা আশা করছেন, মঙ্গলবারের মধ্যে মার্কিন পক্ষের সিদ্ধান্ত তেহরানকে জানিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
আরাগচি আরও বলেন, ‘এখন আমাদের পুরো মনোযোগ শুধুই হরমুজ প্রণালির দিকে। আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, আমাদের শর্তগুলো পূরণ হলেই কেবল প্রণালিটি আবার উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।’
এর আগে নিউইয়র্কে আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। অবরুদ্ধ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান যে শর্তগুলো দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো–লেবাননসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবিলম্বে অন্তত সাত দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি। মার্চে তেহরানের সমর্থনে ইসরায়েলে হামলার পর থেকে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের তীব্র লড়াই চলছে।
এ ছাড়া বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সব বাজেয়াপ্ত সম্পদ মুক্ত করা, তেল খাতের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান সার্বিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দাবি করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন দাবি করছে, প্রণালি দিয়ে বর্তমানে নিয়মিত তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে। কিন্তু তেহরান বলছে, নৌপথটি পুরোপুরি অবরুদ্ধ রয়েছে।
মঙ্গলবার ইরানের সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী আদর্শিক শাখা ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, প্রণালি স্বাভাবিক রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে তথ্য দিচ্ছে তা চরম মিথ্যাচার।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, ‘অন্ধকারের আড়ালে জাহাজের পরিচয় শনাক্তকারী রেডিও সংকেত বন্ধ রেখে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ও বিপুল খরচে মাত্র কয়েকশ ব্যারেল তেল পাচার করা কখনোই প্রণালি খোলা থাকার প্রমাণ হতে পারে না। প্রকৃত অর্থে উন্মুক্ত প্রণালি হলো সেটি, যেখানে আগের মতো দৈনিক অন্তত ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ নির্দ্বিধায় চলাচল করবে এবং প্রতিদিন অন্তত ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য পরিবাহিত হবে।’
কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে মোহেবি আরও বলেন, ‘যেকোনো জাহাজ প্রণালি দিয়ে জোরপূর্বক যাওয়ার চেষ্টা করলে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হয় আমরা সেটিতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাব, নয়তো সেটি সাগরে পাতা মাইনগুলোতে আঘাত করে ধ্বংস হবে।’


