মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিভিন্ন কারখানা ও স্থাপনায় যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী ও মূল্যবান মালামাল আনার মাঝেই একের পর এক চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত এপ্রিল মাসের পর থেকে এমন তিনটি ঘটনা ঘটেছে–একটি চুরির চেষ্টা, নির্মাণাধীন কারখানায় সংঘবদ্ধ ডাকাতি এবং বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরি। এসব ঘটনার পর বিনিয়োগকারীরা কঠোর নিরাপত্তা, প্রবেশপথে কড়া নজরদারি এবং পুলিশি টহল বাড়ানোর দাবি তুলেছেন।
সবশেষ ঘটনাটি ঘটে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) অধীনে নির্মাণাধীন ‘ইনভেস্টর ক্লাব’ থেকে প্রায় ৪ লাখ টাকা মূল্যের ২৫ মিটার বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরি হয়। খবর পাওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে জোরাড়গঞ্জ থানা পুলিশ ক্যাবলগুলো উদ্ধার করে, তবে চোরেরা পালিয়ে যায়।
এর প্রায় দেড় মাস আগে, ৮ আগস্ট রাতে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজের নির্মাণাধীন কারখানায় ঢোকে। তারা নিরাপত্তাকর্মীদের ভয় দেখিয়ে ৩টি মোবাইল ফোন, প্রায় ২৫০ মিটার বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে যায়। প্রায় ৩২ ঘণ্টার অভিযান চালিয়ে পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে এবং চুরি হওয়া তার উদ্ধার করে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত ১৪ এপ্রিল রাত সাড়ে ৩টার দিকে। ৫-৬ জনের একটি দল হেলথ কেয়ার লাইফ সাইন্সের সীমানা প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢোকে। প্রথমে নিরাপত্তাকর্মীদের বাধা পেয়ে ও পরে আরও নিরাপত্তারক্ষী এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যায়। পরে প্রতিষ্ঠানটি জোরাড়গঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।
বিনিয়োগকারীদের কঠোর নিরাপত্তার দাবি
অর্থনৈতিক অঞ্চলে দ্রুত নির্মাণকাজ চলার পাশাপাশি বিভিন্ন মালামাল আনা-নেওয়া বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ, পানি ও অবকাঠামোর মতোই নিরাপত্তাও এখন বিনিয়োগকারীদের মূল দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজের প্রজেক্ট ম্যানেজার আবদুস সামাদ জানান, পুরো এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অননুমোদিত মানুষের প্রবেশ ঠেকানোর মূল দায়িত্ব সরকার ও বেজার।
তিনি বলেন, ‘এটি প্রায় ৩০ হাজার একরের বিশাল এলাকা। এখানে বেজার নিজস্ব সুসংগঠিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রতিটি প্রবেশপথে চেকিং ও নজরদারি আরও বাড়ানো উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘একক কারখানাগুলোর (বিশেষ করে যেগুলো এখনো তৈরি হচ্ছে) পক্ষে কোনো সশস্ত্র বা বড় চোর-ডাকাত দলের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমরা বড় অংকের টাকা বিনিয়োগ করেছি। সবসময় চুরি বা ডাকাতির ভয়ে থাকলে নিশ্চিন্তে ব্যবসা করা যায় না।’
সামাদ জানান, বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যে বেজার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালকের কাছে বিষয়টি জানিয়েছেন। আগামী সমন্বয় সভায় বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরারও পরিকল্পনা করছেন।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি কারখানার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক সংযোগের ক্যাবল, ভারী ট্রান্সফরমার ক্যাবল ও কারখানা বসানোর জন্য আনা মালামাল চুরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এলাকাটি অনেক বড় হওয়ায় নিরাপত্তা দেওয়া কঠিন হচ্ছে। বিশেষ করে, এখানে মোতায়েন করা পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সংখ্যা বিশাল এই এলাকার তুলনায় অনেক কম। পর্যাপ্ত সরকারি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত, অন্তত রাতের বেলা অতিরিক্ত বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী বা স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে পুলিশি টহল বাড়ানোরও দাবি জানান।
নিরাপত্তা বাড়ানোর পরিকল্পনা
বৃহৎ জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের আয়তন ১ হাজার ১৩৮ দশমিক ৫৫ একর।
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১-এর নির্বাহী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাহবুব বলেন, অঞ্চল-১ ও ২-এর নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি নতুন একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছি। আগামী মাসের মধ্যে আরও ১০০ জনের মতো নতুন নিরাপত্তাকর্মী যোগ দেবেন। বর্তমানে আমাদের নিজস্ব ৫০ জন নিরাপত্তাকর্মী এবং ৩০ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।’
তিনি জানান, বর্তমান সীমানা প্রাচীরটি ৬ ফুট উঁচু। এটি বাড়িয়ে ১৩ ফুট করার এবং ওপরে কাঁটাতার দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিল্প পুলিশও এই বিশাল আয়তন ও অসম্পূর্ণ সীমানা প্রাচীরকে নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ-৩-এর সুপারিনটেনডেন্ট মাহমুদা বেগম জানান, পুরো এলাকাটি এখনো সীমানা প্রাচীর বা নিয়ন্ত্রিত গেট দিয়ে ঘেরা সম্ভব হয়নি। এর ফলে যে কেউ সহজে ঢুকে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে শিল্প পুলিশ-৩ একজন পরিদর্শকের নেতৃত্বে এই এলাকায় প্রায় ৫০ জন সদস্য মোতায়েন রেখেছে। এ ছাড়া মিরসরাইয়ের জন্য ১৬০ সদস্যের একটি পৃথক ‘শিল্প পুলিশ-৯ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাদের স্থায়ী ক্যাম্প ও অফিসের জন্য জায়গা নির্বাচনের কথা চলছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এত বড় এলাকায় পুলিশ যখন একদিকে টহল দেয়, দুষ্কৃতকারীরা। অন্যদিকে, সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে নিরাপত্তা স্বাভাবিক রাখতে শিল্প পুলিশ ও জেলা পুলিশ একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।’
তবে পুলিশের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানের নিজেদের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তাতেও কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে।
জোরাড়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল হালিম জানান, অনেক কারখানায় পর্যাপ্ত সীমানা প্রাচীর, সিসিটিভি ক্যামেরা, প্রয়োজনীয় আলো ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় চুরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি জানান, ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর অভিযোগ পেয়েই পুলিশ দ্রুত ক্যাবল উদ্ধার করেছে। এর আগের ডাকাতির ঘটনাতেও জড়িতদের গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধার করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘শিল্পাঞ্চলের অনেক প্রতিষ্ঠানে সুরক্ষার জন্য ন্যূনতম যে ব্যবস্থা দরকার, তাও নেই। অনেক জায়গায় বাউন্ডারি ওয়াল বা সিসিটিভি নেই, রাতে আলোর ব্যবস্থাও দুর্বল।’
তিনি বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হয়ে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক নিরাপত্তা জোরদার করার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মিরসরাই-২ বি অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. তায়েবুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।


