ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম (অনলাইন), অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে ‘হেট স্পিচ’ বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের (ইউএন) মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এই হুমকি মোকাবিলায় সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আন্তধর্মীয় ও আন্তসাংস্কৃতিক সংলাপ নিয়ে আয়োজিত একটি বৈশ্বিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ক্রমবর্ধমান বিস্তার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন আরও গভীর করছে। জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা জাতীয়তার কারণে একে অপরকে লক্ষ্য করে দেওয়া এসব বার্তা এখন আরও বড় পরিসরে এবং দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, এর পরিধি কেবল আপত্তিকর ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সহিংসতা ও সংঘাত উসকে দিতে পারে এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ যেমন- গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও জাতিগত নির্মূলের মতো নৃশংস অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও নতুন প্রযুক্তি এ ধরনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ার জন্য নতুন নতুন পথ তৈরি করছে উল্লেখ করে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ‘বিষাক্ত বার্তাগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং গভীর প্রভাব ফেলছে। এগুলো নতুন রূপ নিচ্ছে, নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তিকে বিদ্বেষ ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।’
এসব বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণাকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখার প্রবণতাও বাড়ছে বলে মনে করেন গুতেরেস। বর্ণবাদ, নারীবিদ্বেষ ও অন্য দেশের প্রতি বিদ্বেষকে উদযাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইহুদিবিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কারণ ও পরিণতি মোকাবিলায় আরও জোরালো উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে আরও বেশি সংলাপের প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলার উদ্যোগ যেন বৈধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করার কাজে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন গুতেরেস। তিনি বলেন, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের অর্থ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিঃশেষ করে দেওয়া নয়। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষতি করা বা ক্ষতি আরও বাড়ানোর যৌক্তিকতা হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, এই সমস্যা মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু জাতিসংঘের নয়। সরকার, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, প্রযুক্তি কোম্পানি, গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়—সবারই এতে ভূমিকা রয়েছে। সবাইকে সম্মিলিতভাবে বিদ্বেষ প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং অনলাইন ও অফলাইন- দুই ক্ষেত্রেই বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে।
পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ‘ভয়, বিদ্বেষ ও সহিংসতার চক্রের অবসান ঘটিয়ে জাতিসংঘ সনদে যে সংহত ও স্থিতিশীল সমাজের কথা বলা হয়েছে, তা গড়ে তুলতে হবে।’


