আগামী সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে আতিথ্য দেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেইজিংয়ের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের বিনিময়ে তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমাতে পারেন ট্রাম্প। এ আশঙ্কায় এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের উদ্বেগ বাড়ছে।
মে মাসে চীনের দাবিকৃত গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রিকে ‘আলোচনার হাতিয়ার’ বলেছিলেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধের কারণে তার জনসমর্থন কমেছে। তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টার মধ্যেই তাইওয়ান নিয়ে সম্ভাব্য ছাড়ের আশঙ্কা বাড়ছে।
২৪ সেপ্টেম্বর সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকে শি তাইওয়ান ইস্যু তুলতে পারেন। তাইপে, টোকিও ও ওয়াশিংটনের সরকারি কর্মকর্তা, আইনপ্রণেতা ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে এ তথ্য উঠে এসেছে।
তাদের মতে, তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে সামান্য পরিবর্তনও বেইজিংকে উৎসাহিত করতে পারে। এতে এ অঞ্চলের ভঙ্গুর শান্তি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এমা চানলেট-অ্যাভেরি বলেন, ‘চীন নীতি কোন পথে যাবে, তা নিয়ে বিশেষ করে আমাদের মিত্রদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নরম হওয়ার কোনো ইঙ্গিতই খুব উদ্বেগজনক হবে।’
চীন তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘মূল স্বার্থগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মনে করে। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে শক্তি প্রয়োগের পথও তারা কখনো পরিত্যাগ করেনি।
এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হোয়াইট হাউস কোনো প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
ট্রাম্প বলেছেন, শি তাকে ব্যক্তিগতভাবে আশ্বস্ত করেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় চীন তাইওয়ানে হামলা চালাবে না। তার পূর্বসূরি জো বাইডেন বারবার বলেছেন, চীন তাইওয়ানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে। তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
মঙ্গলবার বেইজিংয়ে এক প্রতিরক্ষা ফোরামে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত কুই তিয়ানকাই বলেন, তাইওয়ানের সঙ্গে ‘পুনর্মিলন’ এমন স্থিতিশীলতা আনবে, যা ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে’।
তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে তাইপে ও টোকিও
শীর্ষ বৈঠকের আগে তাইওয়ান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে বলে সোমবার তাইপেতে সাংবাদিকদের জানান দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শেন ইউ-চুং।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, তাইওয়ানের ক্ষতি করে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হবে না।’
তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং মঙ্গলবার বলেন, শি বৈঠকে তাইওয়ান প্রসঙ্গ তুলবেন বলে তিনি মনে করেন। তবে ওয়াশিংটন বারবার জানিয়েছে, তাইওয়ান নিয়ে তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি গত বছর বলেছিলেন, তাইওয়ান নিয়ে সংঘাতে টোকিও জড়িয়ে পড়তে পারে। তাঁর মন্তব্যে বেইজিং ক্ষুব্ধ হয়। শির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের আগে তিনিও ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন বলে জাপানের সরকারি দুটি সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফর করেছেন। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
আগামী সপ্তাহের শুরুতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ট্রাম্প ও তাকাইচির সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্মকর্তার সফর নিয়ে মন্তব্য করেনি। তাকাইচি ও ট্রাম্পের যোগাযোগের বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে তারা।
মন্ত্রণালয় বলেছে, আসন্ন ট্রাম্প-শি বৈঠক তারা ‘গভীর আগ্রহের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে’। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করে টোকিও।
জাপান চায়, তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্প প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষা বজায় রাখুন। মে মাসে বেইজিংয়ে শির সঙ্গে বৈঠকের মতো এবারও তাইওয়ান যেন আলোচনার মূল বিষয় না হয়, সেটিও চায় টোকিও।
জাপানের ক্ষমতাসীন দলের দুই জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা বলেন, চীনা পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি আদায়ের বিনিময়ে ট্রাম্প তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নরম করতে পারেন। এটিই জাপানের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প এমন অর্থনৈতিক অর্জন ভোটারদের সামনে তুলে ধরতে পারেন বলে তাঁরা মনে করেন। আইনপ্রণেতারা পরিচয় প্রকাশ করেননি।
‘বিশ্ব বদলে দিতে পারে এমন সংঘাত’
ট্রাম্প শির সঙ্গে বৈঠককে দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে মে মাসের বেইজিং বৈঠকে শি বারবার তাইওয়ান নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন। অস্ত্র বিক্রি ও তাইওয়ান রক্ষায় ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতিও আলোচনায় ছিল।
তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজ কয়েক মাস ধরে ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। মে মাসের বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, তিনি প্যাকেজটি আপাতত স্থগিত রেখেছেন। এটিকে ‘খুব ভালো আলোচনার হাতিয়ার’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক ও ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উ শিনবো মঙ্গলবার বেইজিংয়ের প্রতিরক্ষা ফোরামে বলেন, দীর্ঘদিন উপেক্ষা করার পর অস্ত্র বিক্রি নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগকে এখন ওয়াশিংটনের গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ত্র বিক্রির বাইরে তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে সামান্য পরিবর্তনও বেইজিংকে উৎসাহিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণ করে। এর আওতায় তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবস্থান নেয় না। তাইওয়ান চীনের অংশ, বেইজিংয়ের এই অবস্থানকে সমর্থন না করে যুক্তরাষ্ট্র তা স্বীকার করে।
২০২৩ সালের এক শীর্ষ বৈঠকে বাইডেনকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার স্পষ্ট নিন্দা জানাতে বলেছিলেন শি। তবে ওয়াশিংটন তা প্রত্যাখ্যান করে। জাপানের সরকারি দুটি সূত্র বলেছে, স্পর্শকাতর এই ইস্যুতে ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক মন্তব্যের প্রবণতা বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।
মালয়েশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মহাপরিচালক রাজা নুশিরওয়ান জয়নাল আবিদিন চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরে বলেন, তাইওয়ান বেইজিংয়ের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশ তা অনেকটাই অবমূল্যায়ন করে।
তাইওয়ান বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন করে। চীন দ্বীপটিতে হামলা চালালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হবে।
রাজা নুশিরওয়ান বলেন, ‘এটি আমাদের পরিচিত বিশ্বকে বদলে দেবে। তাই এ বিষয়ে আমাদের খুব, খুব সতর্ক থাকতে হবে।’ সূত্র: রয়টার্স


