সিরাজগঞ্জে গত আট বছরে একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশারও নতুন নিবন্ধন হয়নি। অথচ জেলার বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে অবাধে চলাচল করছে ৪০ হাজারের বেশি নিবন্ধনহীন সিএনজি অটোরিকশা। অভিযোগ রয়েছে, আইন প্রয়োগের শিথিলতা এবং মালিক সমিতির কথিত ‘টোকেন বাণিজ্যের’ কারণে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, অনিবন্ধিত ও কাগজপত্র নবায়ন না করা যানবাহনের কারণে সরকারের প্রায় ৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়েছে।
এদিকে অবৈধ এসব যানবাহনের বকেয়া জরিমানা মওকুফ করে নিবন্ধন ও কাগজপত্র হালনাগাদের সুযোগ দিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) চিঠি দিয়েছেন সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক। প্রশাসনের এমন উদ্যোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিয়মিত কর-ফি পরিশোধকারী পরিবহন মালিকরা।
বিআরটিএ থেকে তথ্য অধিকার আইনের (আরটিআই) মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ জেলায় নিবন্ধিত সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা চার হাজার ১০টি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর একটি সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়। এরপর গত আট বছরে নতুন কোনো সিএনজি নিবন্ধন দেওয়া হয়নি।
শুধু নতুন নিবন্ধনই নয়, আগে নিবন্ধিত অনেক যানবাহনের ফিটনেস, রুট পারমিট ও ট্যাক্স টোকেনও দীর্ঘদিন ধরে নবায়ন করা হয়নি। ফলে সড়কে চলাচলকারী নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত বিপুলসংখ্যক সিএনজি অটোরিকশার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি নিয়মে ফিটনেস, রুট পারমিট, কর ও অন্যান্য ফি পরিশোধ করে কাগজপত্র হালনাগাদ করার পরিবর্তে অনেকে চালক-মালিক সমিতির নির্ধারিত ‘টোকেন’ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাসে ৫০০ টাকা করে ‘টোকেন’ বা স্টিকার সংগ্রহ করলে সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানি থেকে রেহাই পাওয়া যায়। ৪০ হাজারের বেশি যানবাহনের ক্ষেত্রে মাসে প্রায় দুই কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ২৪ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
তবে এই টাকা কোথায় যাচ্ছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এর সঙ্গে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না-তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘদিন নবায়ন না করায় প্রতিটি যানবাহনের বিপরীতে কর, ফি ও জরিমানা বাবদ বড় অংকের বকেয়া জমেছে। নিবন্ধিত চার হাজার ১০টি সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রেই বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ৬৮ কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রায় ৩৫ হাজার অনিবন্ধিত সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন ও কাগজপত্রের বিপরীতে সম্ভাব্য রাজস্ব যোগ করলে সরকারের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের হিসাব।
এ অবস্থায় অটোরিকশা ও অটো-টেম্পো মালিক সমিতির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ জুলাই সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা যাত্রী-পণ্য পরিবহন কমিটির সভাপতি মো. আমিনুল ইসলাম বিআরটিএ চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন। চিঠিতে অবৈধ সিএনজিগুলোর নিবন্ধন ও কাগজপত্র হালনাগাদের সুযোগ দিতে বকেয়া জরিমানা মওকুফের সুপারিশ করা হয়েছে।
শহরের এক ট্রাক মালিক বলেন, ‘আমরা নিয়মিত কর ও জরিমানা দিয়ে গাড়ি চালাই। আর অবৈধ সিএনজিগুলো বছরের পর বছর মহাসড়ক দখল করে সুবিধা ভোগ করবে, পরে প্রশাসন তাদের শত শত কোটি টাকার জরিমানা মওকুফ করবে-এটা কেমন বিচার? কয়েকটি মোবাইল কোর্ট বসিয়ে প্রশাসন দায় এড়াতে পারে না।’
সিরাজগঞ্জ বিআরটিএর মোটর ভেহিকল ইন্সপেক্টর তাজুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সভা হয়েছে। সেখানে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও অটোটেম্পোগুলোর নতুন করে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমিতির নেতাদের রহস্যময় ভূমিকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারণার অভাবে এখনো কেউ নিবন্ধন করতে আসেনি।
সচেতন মহলের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধনহীন ও কাগজপত্রবিহীন যানবাহন চলাচলের সুযোগ দেওয়ার পেছনে কারা দায়ী, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রশ্ন উঠেছে-আইন সবার জন্য সমান হলে বছরের পর বছর অবৈধভাবে চলাচলকারী হাজার হাজার সিএনজি কীভাবে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে? আর তাদের বিপুল বকেয়া জরিমানা মওকুফের উদ্যোগের পেছনে কি শুধুই জনস্বার্থ, নাকি এর আড়ালে রয়েছে কোনো কায়েমি স্বার্থ?


