পদ্মার বুকে বিস্তীর্ণ চর। চারদিকে সাদা বালু, নদীর জলরাশি, খোলা আকাশ ও দিগন্তজোড়া প্রাকৃতিক পরিবেশ। ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় চরের রূপ। বর্ষায় নদীর জলরাশি, আর শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ বালুচর। এ পরিবর্তনশীল রূপের কারণে রাজশাহীর পদ্মার মিডল চর এখন ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত।
‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামটি মূলত চরের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতীকী উপমা। বিস্তীর্ণ বালুর ওপর নদীর জলরাশি, দূরের সবুজের রেখা, খোলা আকাশ ও উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলে এখানে তৈরি হয় ভিন্ন ধরনের দৃশ্যপট। বিশেষ করে শীত ও শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘ বালুচর জেগে উঠলে নদী, বালু ও আকাশের মিলিত দৃশ্য দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারে।
মিডল চরকে ঘিরে রাজশাহীতে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এখানে নৌভ্রমণ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা এবং চরাঞ্চলের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে পর্যটন গড়ে উঠতে পারে।
রাজশাহীর পর্যটন মানচিত্রে মিডল চর যুক্ত হলে প্রকৃতি ও নদীকেন্দ্রিক পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। শহরের পদ্মার তীরের পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্থাপনা, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর ও পুঠিয়ার মন্দিরনগরীসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের সঙ্গে মিডল চরকে যুক্ত করে নতুন পর্যটন সার্কিট তৈরির সুযোগ রয়েছে।
শীত মৌসুমে বিস্তীর্ণ বালুচরে হাঁটা, নদীতে নৌভ্রমণ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা, ছবি তোলা এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারে। স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও চরবাসীর জীবনযাত্রাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর পরিধি আরও বাড়তে পারে।
তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়। মিডল চর নদীকেন্দ্রিক ও মৌসুমি হওয়ায় নৌপথে নিরাপদ ও অনুমোদিত নৌযান নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত লাইফ জ্যাকেট রাখা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বন্ধ করা এবং দক্ষ চালক নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আবহাওয়া ও নদীর পরিস্থিতি বিবেচনায় নৌযান চলাচলের ব্যবস্থাও করতে হবে।
চরের বিভিন্ন অংশে নদীর গভীরতা ও বালুর প্রকৃতি একরকম নয়। কোথাও বালু শক্ত, কোথাও নরম বা ভাঙনপ্রবণ। নদীর স্রোতও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ চলাচলের এলাকা নির্ধারণ, ঝুঁকিপূর্ণ অংশে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যাতায়াত সীমিত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পানিতে নামার প্রবণতা বিবেচনায় নিরাপদ স্থানে নির্ধারিত ‘সেফ জোন’ তৈরি করা যেতে পারে। শিশু ও পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারের জন্য প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, লাইফ বয়া, উদ্ধার নৌযান, প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা, জরুরি যোগাযোগ নম্বর প্রদর্শন এবং পর্যাপ্ত আলোকসজ্জার ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। নৌঘাট ও সমাগমস্থলে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী ও নজরদারি ব্যবস্থা থাকলে নিরাপত্তাঝুঁকি কমানো সম্ভব।
মিডল চরের বড় সম্পদ এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। তাই পর্যটন উন্নয়নের নামে অতিরিক্ত কংক্রিটের স্থাপনা, অপরিকল্পিত দোকানপাট, প্লাস্টিক বর্জ্য, শব্দদূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হলে চরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে শুরু থেকেই পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে বসা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে নদী ও চরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ওপর পর্যটনের প্রভাবও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
পদ্মার চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থাও পরিবর্তনশীল। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে চরের বড় অংশ তলিয়ে যেতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে নতুন বালুচর জেগে ওঠে, কোথাও ভাঙন দেখা দিতে পারে এবং নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই স্থায়ী ও ভারী অবকাঠামোর পরিবর্তে নদীর গতিপ্রকৃতি ও মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা প্রয়োজন।
পর্যটনের বিকাশ হলে চরাঞ্চলের মানুষেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় তরুণদের নৌযান পরিচালনা, পর্যটক গাইড, নিরাপত্তা ও উদ্ধারকাজ, খাবারের দোকান, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য পর্যটনসেবায় যুক্ত করা সম্ভব। স্থানীয় নারীদের খাবার, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগও রয়েছে।
মিডল চরকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। শহর থেকে চরে যাওয়ার পথ, নৌঘাট, নৌযানের নিরাপত্তা এবং মৌসুমি যাতায়াতকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে। নৌঘাটে যাত্রী ওঠানামার নিরাপদ ব্যবস্থা, অপেক্ষার স্থান, ভাড়া বা টিকিট ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আসতে পারে।
ভবিষ্যতে পদ্মার তীর থেকে নৌপথে মিডল চর ভ্রমণ, চর ঘুরে দেখা এবং আবার নগরীতে ফিরে আসার মতো পরিকল্পিত পর্যটন প্যাকেজ চালু করা যেতে পারে। এর সঙ্গে রাজশাহীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটনকেন্দ্রগুলো যুক্ত করা গেলে সমন্বিত পর্যটন সার্কিট তৈরির সুযোগ রয়েছে।
তবে পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে চরবাসীর স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার নামে স্থানীয় মানুষের চলাচল, বসতি, কৃষিকাজ কিংবা জীবন-জীবিকায় যেন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয়দের উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশীদার করা গেলে পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণেও তাঁদের ভূমিকা তৈরি হতে পারে।
এই সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে রেখে গত ২৮ আগস্ট পদ্মার মিডল চর পরিদর্শন করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান।
পরিদর্শনকালে তারা চরটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীতীরবর্তী পরিবেশ ও পর্যটনসহ বিভিন্ন সম্ভাবনার দিক ঘুরে দেখেন। একই সঙ্গে চরের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের জীবনযাপন ও সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও এলাকার সম্ভাবনাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়েও মতবিনিময় করেন।
রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘পদ্মার মিডল চরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিত এই জায়গাটিকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনের আওতায় আনার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে নদী ও চরের প্রাকৃতিক পরিবেশ, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে মিডল চরকে গড়ে তোলা গেলে এটি রাজশাহীর পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।’
পরিদর্শনের সময় পদ্মার মিডল চরকে রাজশাহীর পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাব্য বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ, নদীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয় উঠে আসে।
প্রকৃতির নিজস্ব সৌন্দর্যে ইতোমধ্যে মানুষের নজর কেড়েছে পদ্মার মিডল চর। ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামটি সেই সৌন্দর্যেরই প্রতীকী পরিচয়। পরিকল্পিত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চরকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।


