কাপড় ধোয়ার জন্য নিয়মিত এক কেজির ডিটারজেন্ট প্যাকেট ব্যবহার করেন গৃহিণী বেবিনাজ আক্তার তমা। সম্প্রতি একটি কোম্পানির নতুন এক ধরনের ডিটারজেন্ট বাজারে দেখে তা বাসায় নিয়ে আসেন। বাসায় এসে পরীক্ষা করতেই চমকে ওঠেন তিনি; প্যাকেটটি এক কেজির নয়, বরং ৯০০ গ্রামের।
তমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এক কেজি ভেবেই বাসায় নিয়েছিলাম। দাম রাখল ২৩৫ টাকা, যা আগের এক কেজির প্যাকেটের দামের সমান। এভাবে ১০০ গ্রাম পাউডার কমিয়ে একই দামে বিক্রি করা ভোক্তাকে ঠকানো ছাড়া আর কিছু নয়।’
তমা একা নন, তার মতো অসংখ্য সাধারণ ক্রেতা প্রতিদিন বাজারে গিয়ে একই ধরনের বিভ্রান্তি ও কৌশলের মুখোমুখি হচ্ছেন। বাজারে হঠাৎ করে পণ্যের ওজনে এমন বৈচিত্র্য ও গরমিল আসার নেপথ্যে রয়েছে সরকারি মান পরীক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মোড়কজাতকরণ বিধিমালার সাম্প্রতিক সংশোধন।
এক বছর আগেও ইচ্ছেমতো অপ্রচলিত ওজনে পণ্য মোড়কজাত করে বাজারে ছাড়ার সুযোগ ছিল না। ২০০৭ সালে বিএসটিআই প্রথম যে ‘পণ্য মোড়কজাতকরণ বিধিমালা’ তৈরি করে, সেখানে সুনির্দিষ্ট ওজনের বাধ্যবাধকতা ছিল। উদাহরণস্বরূপ, আগে ভোজ্যতেল এক লিটারের জায়গায় ৯৫০ মিলিলিটারের বোতলে বিক্রি করা হতো, যা ক্রেতারা ভুলবশত এক লিটার ভেবেই কিনতেন। ২০০৭ সালের বিধিমালার মাধ্যমে এই চালাকি বন্ধ করা হয়। ওই বিধিমালার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সাধারণ মানুষের কেনাকাটার মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সংগতি রেখে ২৫০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম, ১ কেজি, ২ কেজির মতো নির্দিষ্ট ওজনের প্যাকেট বাধ্যতামূলক করা।
২০২৫ সালে বিধিমালাটি সংশোধন করার আগপর্যন্ত ৫০০ গ্রামের ওপরে কেবল ১ কেজি, ১.৫ কেজি বা ২ কেজির মতো সুনির্দিষ্ট মাপে ডিটারজেন্ট বিক্রির নিয়ম ছিল। চাল, আটা, তেল, সাবান, সস, মধুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেও নির্ধারিত ওজন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা ছিল।
তবে কোনো রকম গণশুনানি ছাড়াই ২০২৫ সালে এই বিধিমালা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, ডিটারজেন্টের ক্ষেত্রে ৫০০ গ্রামের পর প্রতি ৫০ গ্রামের গুণিতকে যেকোনো পরিমাণে পণ্য বাজারজাত করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ৫৫০ গ্রাম, ৬০০ গ্রাম, ৬৫০ গ্রাম, ৯০০ গ্রামের মতো প্যাকেট বাজারে আসছে।
আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই বেবিনাজ আক্তার তমার হাতে এসেছে ৯০০ গ্রামের প্যাকেট। তমা জানান, কাছাকাছি দামের পণ্য ৯০, ১১৫ কিংবা ১৩৫ গ্রামের প্যাকে বিক্রি হওয়ায় বাজারে গিয়ে কোনটা প্রকৃতপক্ষে সাশ্রয়ী, তা দ্রুত হিসাব করে বের করা ক্রেতাদের জন্য বাড়তি মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই ধরনের বিভ্রান্তির কথা জানান মেজবাউল হক সীমান্ত নামের আরেক ক্রেতা। তিনি বাজারে গিয়ে লন্ড্রি সাবানের ১৩০ গ্রামের একটি প্যাক দেখে থমকে যান। সীমান্ত বলেন, ‘ক্রেতারা সাধারণত পণ্যের মোট দাম দেখে কেনেন, প্রতি ১০০ গ্রাম বা কেজির দাম আলাদা করে হিসাব করার সময় বা মানসিক প্রস্তুতি থাকে না। ক্রেতা হিসেবে সবার মনে ১২৫ বা ১৫০ গ্রামের একটা ধারণা থাকে। কিন্তু বাজারে হঠাৎ ১৩০ বা ১৩৫ গ্রামের পণ্য দেখলে সেটির দাম আসলে বাড়ল নাকি কমল, তা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা খুবই কঠিন।’
আরেক ভোক্তা সুরাইয়া আক্তার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, অপ্রচলিত ও কৌশলী ওজনের সুযোগ নিয়ে কোম্পানিগুলো দাম একই রেখে গোপনে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইদানীং ক্যাচাপ, সয়াসস বা কাসুন্দির মতো পণ্যের ওজন খুব এলোমেলো। কোনোটি ৩৪০ গ্রাম, কোনোটি ২২০ গ্রাম, আবার কোনোটি ২৮৫ গ্রাম। কোনটা কিনলে বেশি লাভ হবে, তা বোঝাই যায় না। হয়তো আগের দামের চেয়ে ১০-২০ টাকা এদিক-সেদিক করা হচ্ছে, কিন্তু ভেতরের ওজনের হিসাব করলে ক্রেতারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
পরিসংখ্যান ও বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় সব কোম্পানিই ৩০০ গ্রামের ড্রাই কেক বিক্রি করলেও একটি কোম্পানি বাজারে এনেছে ২৯০ গ্রামের প্যাকেট। আবার বাজারে ২১৭ গ্রামের মধু, ২৮৫ গ্রামের কাসুন্দি এবং ৪৯০ গ্রাম বা ৫৭০ গ্রামের বারবিকিউ সসও পাওয়া যাচ্ছে। আগে যেসব প্রতিষ্ঠান ২৫০ গ্রামের টমেটো সস বিক্রি করত, নতুন বিধিমালার সুবাদে তারা তা ১০ গ্রাম কমিয়ে ২৪০ গ্রামে নামিয়ে এনেছে। ছোট ছোট এই পরিবর্তনগুলো খালি চোখে ক্রেতার নজরে আসে না, কিন্তু লাখ লাখ প্যাকেট বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানিগুলো তাদের লাভের অঙ্ক ঠিকই বাড়িয়ে নিচ্ছে।
বিধিমালা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের আগে সাবান ও ডিটারজেন্টের ক্ষেত্রেও কঠোর ধাপ নির্দিষ্ট ছিল। লন্ড্রি সাবানের ক্ষেত্রে ৫০ গ্রামের পর ৭৫, ১০০, ১২৫, ১৫০, ১৭৫ ও ২০০ গ্রাম এবং পরবর্তী সময়ে ৫০ গ্রামের গুণিতক বাধ্যতামূলক ছিল। বাথসোপ ও টয়লেট সোপের ক্ষেত্রে ১৫০ ও ১৭৫ গ্রামের পর ২৫ গ্রামের গুণিতক মেনে চলতে হতো। কিন্তু গত বছরের ২৪ জুলাই জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপনে সব ধরনের টয়লেট, বাথ ও ডিটারজেন্ট বারকে একই শ্রেণিতে এনে ১৫০ গ্রামের নিচের সব পণ্যের ওপর থেকে ওজনের সীমা সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে।
এই সুযোগে বর্তমানে বাজারে ৯০ গ্রামের লাক্স, ১১৫ গ্রামের স্যাভলন, ১৩৫ গ্রামের ডাভ কিংবা ১৩০ গ্রামের হুইল, তিব্বত ও কেয়া সাবান অবাধে বিক্রি হচ্ছে। কারণ, এগুলো সবই ১৫০ গ্রামের নিচে এবং নতুন আইনের দৃষ্টিতে বৈধ।
সাবানের বাইরে কফির ক্ষেত্রে অনিয়মিত প্যাকের সীমা ৫০ গ্রামের বদলে ১০০ গ্রামের নিচে নেওয়া হয়েছে। চাল ও ডালজাতীয় খাদ্যশস্যে ৫ কেজির পর আগে ৫ কেজির গুণিতক (১০, ১৫ কেজি) মানতে হলেও এখন প্রতি ১ কেজির গুণিতকে (৬, ৭, ৮ কেজি) বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসটিআই-এর মেট্রোলজি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মাজহারুল হক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ভোক্তা ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদা এবং সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরবর্তীতে কোম্পানি, ভোক্তা অধিকার প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভার ভিত্তিতেই ওজনের আকার পরিবর্তন করা হয়েছে।’
সাবান বা পাউরুটির মতো পণ্য তৈরির পর শুকিয়ে গিয়ে কিছুটা ওজন কমতে পারে বলে আইনে সামান্য সহনীয় সীমা রাখা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মাজহারুল হক।
তবে সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নতুন বিধিমালা জারির কথা অস্বীকার করেন ভোক্তা অধিকার সংস্থা ‘কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ক্যাব)-এর সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তিনি জানান, ‘পণ্যের ওজন বা মোড়কের পরিমাণ পরিবর্তনের বিষয়ে বিএসটিআই বা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান ক্যাবের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করেনি।’
সফিকুজ্জামান আরও বলেন, ‘যেহেতু আইনে এখন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তাই অপ্রচলিত ওজনে পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ নয়। তবে আমাদের মূল উদ্বেগ হলো, কোম্পানিগুলো দাম এক রেখে ওজনের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে কি না এবং এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ আছে কি না।’
কোম্পানিগুলোর এই সুচতুর বাজারজাতকরণ কৌশল সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসমাঈল হোসেন বলেন, ‘ভোক্তারা সাধারণত ২৫০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম কিংবা এক কেজির পরিচিত প্যাকেটে কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত। কোম্পানিগুলো ক্রেতাদের এই অভ্যাসের সুযোগ নেয়। তারা এক কেজির জায়গায় ৯০০ গ্রাম বা ৫০০ গ্রামের জায়গায় ৪৫০ গ্রাম করলেও প্যাকেটের বাহ্যিক নকশা বা আকারে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে না। ফলে ক্রেতারা তাৎক্ষণিকভাবে ওজনের এই পরিবর্তন টের পান না। মার্কেটিংয়ের ভাষায় সূক্ষ্ম ও খালি চোখে না ধরা পড়ার মতো এই পরিবর্তনকে জাস্ট নোটিসেবল ডিফারেন্স (জেএনডি) বলা হয়।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই কৌশলের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের পক্ষে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যের আসল দামের তুলনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ওজন কম থাকার বিষয় অনুধাবন করে তারা প্রতারিত ও ক্ষুব্ধ বোধ করেন।


