গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ ছয় দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে সমাপনী জনসভার মধ্য দিয়ে শনিবার শেষ হয়েছে। তবে কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা, জনসম্পৃক্ততা ও জ্বালানি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় বিএনপি।
রোববার চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ আজিজ বলেন, দেশে এখনো লংমার্চ করার মতো রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। জ্বালানি সংকটের মধ্যে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস খরচ করে এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজনও যৌক্তিক নয়।
এম এ আজিজ বলেন, ‘বাংলাদেশে লংমার্চ করার মতো পরিবেশ বা পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। জামায়াত জোটের তো দেশব্যাপী সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। তাদের প্রতিবাদের প্রয়োজন থাকলে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস অপচয় করে লংমার্চ না করে এলাকা, থানা বা উপজেলাভিত্তিক সভা-সমাবেশ করতে পারত।’
লংমার্চে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত সাড়া ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, অতীতে এ ধরনের কর্মসূচিতে সড়কের পাশে সাধারণ মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা যেত, এবার তেমন চিত্র দেখা যায়নি।
এম এ আজিজ বলেন, এই লংমার্চে সাধারণ মানুষের তেমন কোনো সাড়া দেখা যায়নি। রাস্তার মোড় বা জমায়েতের পয়েন্টগুলোতে কিছু মানুষ ছিল, কিন্তু সেগুলো তো স্বাভাবিক পথচারীদের ভিড়।
তবে জ্বালানি সংকট যে বাস্তব, তা স্বীকার করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্তও দায়ী। একটি গ্রুপকে দেওয়া কাজের কার্যাদেশ অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করলেও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। একটি প্রকল্প চালু হতে অন্তত দুই বছর সময় লাগে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন মনে করেন, মাত্র ছয় মাসের সরকারের কাছে আগের সরকারের রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের সব জটিলতার সমাধান আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস। পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ ও গ্যাসের যত জটিলতা ও সমস্যা রয়েছে, তা এই স্বল্প সময়ের মধ্যে সমাধান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এসব সমস্যা নিরসনে কাজ করে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করার চেষ্টা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। নুরুল আমিন বলেন, ‘এটি মূলত অন্য কোনো বিশেষ মহলের বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর আগমনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।’
তবে বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির অধিকার নিয়েও বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। মিরসরাইয়ে বিরোধী দলগুলোর সমাবেশে বিএনপি কোনো বাধা দেয়নি উল্লেখ করে নুরুল আমিন বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু ‘সরকার গঠনের এত অল্প সময়ের মধ্যে এ ধরনের লং মার্চ বা আন্দোলন করা মোটেও শোভন নয়।’
লংমার্চে বাধা না দেওয়ার বিষয়ে এম এ আজিজও একই অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিএনপি এখন হিংসার রাজনীতি পরিহার করে রাজনৈতিক সহাবস্থানের নীতি অনুসরণ করতে চায়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্দেশনাও হলো- কোনো ধরনের উসকানিতে না জড়ানো।
এম এ আজিজ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অন্য দলকে কোনো স্পেস দেয়নি এবং গণতন্ত্রকে পকেটে ভরে রেখেছিল বলেই তাদের এই পতন হয়েছে। আমরা সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাই না।’
সাম্প্রতিক রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের বক্তব্য ও আচরণ নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। এম এ আজিজ বলেন, রাজনীতিতে দূরদর্শিতা, পড়াশোনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকাকে তিনি বড় ঘাটতি হিসেবে দেখছেন। রাজনীতি করতে হলে প্রচুর পড়াশোনা, চর্চা ও গবেষণার প্রয়োজন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোতে এখন রাজনীতির সুনির্দিষ্ট কোনো ইনস্টিটিউশন বা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নেই।’
বিএনপির দুই নেতার বক্তব্যে অবশ্য একটি জায়গায় মিল রয়েছে- জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যের সংকট অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে ছয় মাসের সরকারের বিরুদ্ধে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির বদলে সরকারকে সময় দেওয়া এবং সমালোচনাকে গঠনমূলক রাখার প্রয়োজন রয়েছে।


