বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্রী শারমিন সুলতানা আঁখি গত মাসে ফার্মগেট থেকে বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসে বাড়ি ফিরছিলেন। বাসে যাত্রী ছিল হাতে গোনা। জানালার পাশের আসনে বসা আঁখির পাশে বাস ছাড়ার ঠিক মুহূর্তে এসে বসেন মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পরই ওই ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে আঁখির শরীরের সংবেদনশীল স্থানে কনুই দিয়ে স্পর্শ করতে থাকেন। ঘটনা টের পেয়ে আঁখি চিৎকার করে প্রতিবাদ জানালেও বাসের কোনো যাত্রী তার সাহায্যে এগিয়ে আসেননি। ক্ষুব্ধ আঁখি শেষ পর্যন্ত আসন বদলে অন্য জায়গায় বসতে বাধ্য হন।
টাইমস অব বাংলাদেশ’কে আঁখি বলেন, ‘আমি যখন চিৎকার করে লোকটিকে অসংলগ্ন আচরণের কারণ জিজ্ঞেস করলাম, তখন বাসের অন্য কোনো যাত্রী আমার পক্ষে একটি কথাও বলেনি।’
রাজধানী ঢাকায় নারীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, আঁখির এই অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ঢাকার রাস্তায় এটি নিত্যদিনের চিত্র।
অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটির ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী শতভাগ নারীই চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। ‘স্ট্রিট হ্যারাসমেন্ট ইন বাংলাদেশ: উইমেনস এক্সপেরিয়েন্সেস অ্যান্ড পারসেপশনস ইন আরবান সেটিংস’ শীর্ষক এই গবেষণায় অশালীন অঙ্গভঙ্গি, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, গা ঘেঁষে দাঁড়ানো, অনুসরণ করা এমনকি নারী দেখে প্রকাশ্যে হস্তমৈথুনের মতো ঘটনার কথাও উঠে এসেছে।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সেন্টার অব এক্সিলেন্স ফর আরবান ইকুইটি অ্যান্ড হেলথ (সিইউইএইচ)-এর ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৭৯ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার হলেও যৌন হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন।
তাদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ নারী অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শের শিকার হয়েছেন, আর ৩৬ শতাংশ নারী গণপরিবহনে চালকের সহকারীদের (হেলপার) মাধ্যমে অহেতুক স্পর্শের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া ৫৪ শতাংশ নারী অশালীনভাবে তাকিয়ে থাকা, ৪০ শতাংশ অশালীন বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং ৪৮ শতাংশ নারী জানিয়েছেন যে বাসের যাত্রীরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের খুব কাছাকাছি অস্বস্তিকরভাবে এসে দাঁড়িয়েছে।
যৌন ও সাধারণ হয়রানির শিকার হওয়া ৫৬ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, এই ঘটনার পর তারা মানসিক আতঙ্কের মধ্য দিয়ে গেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। গত দুই বছরে হাজার হাজার ভুক্তভোগী নারী তাদের পোশাক নিয়ে কটূক্তি ও হয়রানির প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সোচ্চার হয়েছেন। ক্ষমতাসীন বিএনপিও তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারণায় নারীদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।
বিএনপির প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে সাইবার স্পেসে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষায়িত নারী সহায়তামূলক সেল গঠন এবং নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা উদ্যোগ।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও নারীদের মনের ভেতরের ক্ষোভ ও হতাশা দূর হয়নি।
প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার ইমা টাইমস’কে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নারীই কোনো না কোনো হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতা কেবল তাদের নিজস্ব সাহসের ওপর নির্ভর করবে। নাকি এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ একসাথে মিলে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?’
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও এখন হয়রানির আরেকটি বড় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট বা মন্তব্য করার আগেও আমাদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবতে হয়। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে নারীদের ছবি দিয়ে অশালীন ছবি বা ভিডিও তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি ডিরেক্টর দীপ্তি শিকদার বলেন, রাস্তায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং পুলিশের অপর্যাপ্ত টহল নারীদের নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ।
টাইমস’কে তিনি বলেন, ‘ঢাকার অনেক রাস্তায় পর্যাপ্ত আলো নেই, আর পুলিশের টহলও প্রয়োজনের তুলনায় কম। এসব কারণে নারীরা প্রতিনিয়ত এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে শহরে চলাচল করেন।’
দীপ্তি শিকদার আরও জানান, নারীদের প্রতি এমন মনোভাব নতুন কিছু নয়।
নিজের কলেজ জীবনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালের দিকেও যখন আমি বেগম বদরুন্নেসা কলেজের পেছনের রাস্তা দিয়ে যেতাম, তখন রিকশাচালকদের কাছ থেকে অশালীন অঙ্গভঙ্গির শিকার হতাম। তাদের কেউ কেউ কুরুচিপূর্ণভাবে পোশাক গুটিয়ে বসে থাকত।’
তিনি বলেন, নারীদের স্বাধীনতা ও অগ্রগতিকে আটকে রাখার যে সামাজিক মানসিকতা, সেটাই আজও নানা ধরনের সহিংসতা ও হয়রানিকে টিকিয়ে রাখছে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সালমা আলী বলেন, ‘আমাদের সমাজে নারীদের সবসময় সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন পুরুষ একা হেঁটে গেলে এ ধরনের আক্রমণের শিকার হন না। এমনকি আক্রমণকারী মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হলেও সে অবচেতনভাবেই একজন নারীকে দুর্বল ভেবে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয়।’
তার মতে, বাংলাদেশ এখনো পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে। একারণে সমাজের একটি অংশ এখনো নারীদের উপস্থিতি ও অবাধ চলাচলকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি।
ঘটনার সময় আশেপাশে থাকা সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি বিষয়।
আঁখি জানান, তিনি চিৎকার করার পরও বাসের অন্য কোনো যাত্রী প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেনি। বিভিন্ন দুর্ঘটনা বা সহিংসতার ঘটনায় মানুষজন সহায়তার হাত বাড়ানোর বদলে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতেই বেশি ব্যস্ত থাকে।
সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব একে সম্মিলিত নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘যখন জনাকীর্ণ রাস্তায় একজন নারী সহিংসতার শিকার হন আর চারপাশের মানুষজন তাকে সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে ভিডিও করায় ব্যস্ত থাকে, তখন বুঝতে হবে এই সংকট কেবল একক কোনো ব্যক্তির নয়। এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের ধস, সমষ্টিগত উদাসীনতা এবং জনপরিসরে নারীদের নিরাপত্তাহীনতাকে স্বাভাবিক মেনে নেওয়ার এক ভয়াবহ সামাজিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।’


