ক্লাসে পাঠদানে অবহেলা, প্রাইভেটে ব্যস্ত শিক্ষকরা

ক্লাসে পাঠদানে অবহেলা, প্রাইভেটে ব্যস্ত শিক্ষকরা
কার্টুন: সজীব রায়/টাইমস
Advertisement
Advertisement

নরসিংদীর শিবপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর জন্য শুধু ক্লাসের পড়ালেখাই পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট ছিল না। পড়া বুঝতে তাকে বাধ্য হয়ে স্কুলের সেই শিক্ষকদের কাছেই প্রাইভেট পড়তে হতো, যারা ক্লাসে পড়াতেন।

সম্প্রতি এসএসসি পাস করা ওই ছাত্রী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্কুলে যা পড়ানো হতো, তা একদমই যথেষ্ট ছিল না। অনেক সময় শিক্ষকরা ইচ্ছে করেই কম পড়িয়ে ক্লাস শেষ করে দিতেন। তাই বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়তে হতো।’

তার অভিযোগ, যেসব শিক্ষার্থী শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ত না, তাদের পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়া হতো। ক্লাসেও তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হতো।

তার এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক চরম বাস্তবতা তুলে ধরে। ক্লাসের পড়া দিয়ে শিক্ষার্থীদের চাহিদা না মেটায় প্রাইভেট টিউশন আর কোচিং এখন মূল পড়াশোনার বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে—যেখানে জড়িয়ে আছেন স্কুলের শিক্ষকরাই।

অভিভাবকদের জন্য এখন শুধু স্কুলের বেতন দেওয়াই শেষ কথা নয়। সন্তান যেন সিলেবাস শেষ করতে পারে আর পরীক্ষায় ভালো করে, সেজন্য মূল বেতনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে প্রাইভেট ও কোচিংয়ের পেছনে।

কিছু স্কুলের বেতনের চেয়ে প্রাইভেটের খরচ অনেক বেশি। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানান, প্রাইভেট আর কোচিংয়ের পেছনেই তাদের মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়।

এই সমস্যা শুধু বাংলা মাধ্যমের স্কুলেই আটকে নেই। দামি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের অভিভাবকরাও একই কথা বলছেন। অনেক বেতন দেওয়ার পরও ক্লাসের পড়া দিয়ে কাজ হয় না, তাই বাধ্য হয়ে প্রাইভেট টিউটর ও কোচিংয়ের পেছনে বাড়তি টাকা ঢালতে হচ্ছে।

স্কুলে বড় অঙ্কের বেতন দেওয়ার পরও বাচ্চাদের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে প্রাইভেট পড়ানোকে জরুরি মনে করছেন অভিভাবকরা।

শুধু ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বা হিসাববিজ্ঞানের মতো বিষয়েই এই প্রাইভেট টিউশনির ব্যবসা আটকে নেই। এখন বাংলা, সমাজবিজ্ঞান, এমনকি ইতিহাসের মতো সাধারণ বিষয়গুলোতেও এই ব্যবসা শুরু হয়েছে।

অনেক সময় ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসের মূল শিক্ষকের কাছেই প্রাইভেট পড়ে। এতে করে শিক্ষকরা ক্লাসে ঠিকমতো পড়াচ্ছেন কি না এবং ঠিকভাবে খাতা কাটছেন কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

মিরপুরের শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির এক অভিভাবক বলেন, ‘স্কুলে মাসে ১ হাজার ৯০০ টাকা বেতন দিই। কিন্তু একই স্কুলের শিক্ষকের কোচিং ফি দিতে হয় ৫ হাজার টাকা।’

একই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির আরেক অভিভাবক জানান, ‘স্কুল ফি ১ হাজার ৬৫০ টাকা হলেও ক্লাস শেষের কোচিংয়ের জন্য প্রায় ৩ হাজার টাকা দিতে হয়।’

অভিভাবকদের কথা, প্রাইভেট না পড়লে বাচ্চা পিছিয়ে পড়বে—এই ভয়ে তারা কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হন।

নামকরা স্কুলগুলোতেও এই একই চিত্র। উত্তরার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীল। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীর এক অভিভাবক জানান, ‘স্কুলের ভেতরেই অনেক গাফিলতি থেকে যায়।’

আরও পড়ুন

ক্লাসরুমের জায়গা নিচ্ছে কোচিং সেন্টার

প্রাইভেটের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বিভিন্ন স্কুলের চারপাশে তৈরি হয়েছে কোচিংয়ের আখড়া।

বেইলি রোডের ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মিরপুরের শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের আশপাশে কোচিং ব্যবসা জমে উঠেছে। অনেক শিক্ষক এসব প্রতিষ্ঠানের কাছেই বাসা ভাড়া নিয়ে স্কুলের আগে ও পরে ব্যাচ ধরে পড়ান।

সকালে ক্লাস শুরুর আগে থেকেই কোচিং চালু হয়, আর বিকালে স্কুল শেষের পর তা চলে গভীর রাত পর্যন্ত।

শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের কয়েকজন অভিভাবক জানান, শিক্ষকরা তাদের মূল সময় আর শক্তি স্কুলের বাইরের কোচিংয়ে ঢেলে দেন। ফলে স্কুলের সাধারণ ক্লাসে তাদের কোনো মনোযোগ থাকে না।

ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেইলি রোড শাখার বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক জানান, তারা কেউ প্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুমে প্রাইভেট পড়ান না। তবে নিজ প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থী তাদের কাছে ক্লাসের বাইরে অন্য সময়ে পড়েন, অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও পড়েন। কাউকে প্রাইভেট পড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয় না। প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকরাই তাদের সন্তানদের প্রাইভেট পড়ানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখান।

উত্তরা রাজউক মডলে কলেজের ইংরেজি বিভাগের একজন সাবেক শিক্ষিকা জানান, শিক্ষার্থীরা পড়তে চায়। অভিভাবকদেরও আগ্রহ অনেক। আমি টিউশন ছাড়তে চেয়েও পারিনি। একারণে উত্তরার অন্য একটি স্থানে রুম ভাড়া নিয়ে পড়াতাম। বেতনের চেয়ে টিউশনি করেই কয়েকগুণ বেশি টাকা উপার্জন করেছি। বিভিন্ন কারণে সময়মতো ক্লাসের পড়া ক্লাসে শতভাগ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না- এটা সত্য। এটা শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা, কোনো প্রতিষ্ঠানের না। তবে শিক্ষকদের যে বেতন, তাতে প্রাইভেট পড়ানোর কারণে অনেক শিক্ষক ভালো জীবনযাপন করতে পারেন, নাহলে ঢাকায় থাকা কঠিন হয়ে যেত।

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো এবং ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত কমানো, শিক্ষকতায় বেতন বৃদ্ধি-এসব ব্যাপারে সরকারকে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে, নাহলে প্রাইভেট-কোচিং থাকবেই। শিক্ষকদের বেতন অভাব আছে, তেমনি সামর্থ্যবান অভিভাবকদের চাপের কারণেও এটা শিক্ষকরা থামাতে পারবেন না।’

তবে সরকারি নীতি অনুসারে, সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানোর তালিকা প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে তারা নিজেরাও কখনো দেননি এবং শিক্ষকরা এটা দেয় না বলেও জানান উভয় শিক্ষক।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য শহিদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের গর্ভনিং বডির চেয়ারম্যান ও অ্যাডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ কাজী মো. ফজলুল করিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কাগজেই আটকে আছে নীতিমালা

শিক্ষকরা যাতে নিজেদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করতে না পারেন এবং কোচিং ব্যবসা চালাতে না পারেন, সে জন্য সরকার বারবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই কাজে আসেনি।

২০১২ সালের সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতে বা কোচিং করাতে পারবেন না। এমনকি বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত থাকাও নিষেধ।

তবে এই নিয়ম যে কেউ মানছে না, তা শিক্ষা কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই নীতিমালা প্রায় ১৫ বছর ধরে থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করা হয়নি।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল টাইমসকে বলেন, ক্লাসের পাঠদান অবহেলা করে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেটে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

তিনি বলেন, ‘সরকারি নিয়মের বাইরে কিছু করা হলে এবং অভিভাবকরা লিখিত অভিযোগ দিলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি জানান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলগুলো সরকার-নির্ধারিত ফি নিয়ে বাড়তি ক্লাসের আয়োজন করতে পারে। তবে এতে যোগ দিতে কাউকে জোর করা যাবে না।

বাড়ছে শিক্ষার বৈষম্য

শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাইভেট টিউশনের এই দাপট ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে শিক্ষার বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ধনী পরিবারের সন্তানরা টাকা দিয়ে বাড়তি সুযোগ কিনতে পারলেও গরিবরা তা পারছে না।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান বাড়াতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান মনজুর আহমেদ টাইমসকে বলেন, প্রাইভেট ও কোচিং মূলত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসম সুযোগ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, ‘যাদের টাকা আছে, তারা প্রাইভেট-কোচিং পড়ে ভালো প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর যাদের সামর্থ্য নেই, তারা পিছিয়ে পড়ছে।’

তিনি পরামর্শ দেন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলের ভেতরেই কম খরচে বাড়তি ক্লাসের ব্যবস্থা করা উচিত। এর জন্য শিক্ষকদের বাড়তি টাকা দেওয়া যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, প্রাইভেটের ওপর নির্ভরতা কমানোর একমাত্র উপায় হলো ক্লাসের পড়াশোনার মান বাড়ানো।

তিনি বলেন, ‘স্কুলেই যেন সব পড়া শেষ হয়, সে জন্য ভালো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, যতক্ষণ না ক্লাসের পড়া ভালো হচ্ছে এবং শিক্ষকরা সঠিক প্রশিক্ষণ ও ভালো বেতন পাচ্ছেন ততক্ষণ শুধু আইন করে এই সমস্যা মেটানো যাবে না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর