দেশে চলমান বিদ্যুৎ সংকটের আসল কারণ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার অভাব নয়, বরং জ্বালানির অভাব, ডলার সংকট এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া-ই প্রধান সমস্যা। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা এমনটাই মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট কাটানোর একাধিক পথ সরকারের সামনে খোলা রয়েছে। যেমন—এলএনজি আমদানি বাড়ানো, পর্যাপ্ত কয়লার সরবরাহ রাখা, ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সচল করা, বাড়তি বিদ্যুৎ আমদানি এবং ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা। তবে সিদ্ধান্ত নিতে অনাকাঙ্ক্ষিত দেরি হওয়ায় দেশের বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বেশ কয়েকবার বিদ্যুৎ উৎপাদন তৎকালীন চাহিদাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। গত ২০ মে দেশে রেকর্ড ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি থাকলেও প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব তথ্য প্রমাণ করে কেবল কেন্দ্রের ক্ষমতার অভাবে বিদ্যুৎ সংকট হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জ্বালানি দিতে পারলে এবং দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ নিলে উৎপাদন সহজেই বাড়ানো সম্ভব।
তারা জানান, পরিচালন খরচ কমানো গেলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে ফার্নেস তেল আমদানিতে উচ্চহারে (৩৭ শতাংশ) কর ও ভ্যাট রয়েছে। সংকটের এই সময়ে সরকার এ শুল্ক কমিয়ে আনার কথা চিন্তা করতে পারে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম জানান, সংকট মোকাবিলায় সরকারকে যেকোনো একটি বা একাধিক পথ বেছে নিতেই হবে।
তিনি বলেন, ‘সরকারকে এলএনজি কেনা বাড়াতে হবে, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, অথবা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আমদানি করতে হবে। কিন্তু এসবের জন্যই ডলার প্রয়োজন, যা সরকার সময়মতো মেটাতে পারছে না। ফলে সব ধরনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানি কমছে এবং লোডশেডিং বাড়ছে।’
তার মতে, এই সমস্যা মূলত অর্থসংকটের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। সরকার যেমন লাগামহীন ব্যয় সামলাতে পারছে না, তেমনি সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষেও বিদ্যুতের বাড়তি দাম সহ্য করা অসম্ভব। তাই বিদ্যুৎ খাতের অহেতুক খরচ কমাই একমাত্র সমাধান।
বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকলেও জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার কারণে বাস্তবে পাওয়া যাচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটেরও কম।
যেমন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট হলেও এলএনজি না পাওয়ায় উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে গেছে। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালিতে গোলযোগের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে গিয়ে ডলারের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
একইভাবে, কয়লাভিত্তিক ৮ হাজার ৪৩৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো থেকে আসছে মাত্র ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মতো। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রটি আংশিক বন্ধ। অন্যদিকে, কয়লা না পেয়ে ধুঁকছে রামপাল ও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র। সম্প্রতি রামপাল কেন্দ্র থেকে মাত্র ৩৭০ মেগাওয়াট এবং পায়রার একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় মাত্র ৫৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।
কয়লার টানাপোড়েনে ভারতের আদানি পাওয়ার থেকেও পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যুৎ মিলছে না। এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিপরীতে তারা দিনে মাত্র ৯০০ এবং রাতে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ দিচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়ার উপায় হলো ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করা। ছয় হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলেও এগুলো থেকে এখন মাত্র ৩ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। আমদানিতে ৩৭ শতাংশ কর থাকায় কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এ ছাড়া ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা ‘রুফটপ সোলার’ জাতীয় গ্রিডের ওপর থেকে অনেক চাপ কমাতে পারত। পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতুল্লাহর মতে, উপযুক্ত উৎসাহ ও সুবিধা দিলে মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ছাদের সোলার থেকে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব ছিল।
তিনি আরও বলেন, সরকার আগে সই করা ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরবর্তীতে বিস্তারিত কিছু না জানিয়েই প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও ১১টি সৌর প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ভারত থেকে ২ হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির সুবিধা থাকলেও বাংলাদেশ আনছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
পিডিবি ও পিজিসিবির হিসাব অনুযায়ী, দেশের অন্তত ৬০ থেকে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে; সম্পূর্ণ বন্ধ প্রায় ২০টি কেন্দ্র। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসচালিত, ৩৩টি তেলচালিত এবং ২টি কয়লাচালিত কেন্দ্র। গত বুধবার ১৭ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট চাহিদার দিনেও দেশজুড়ে ২ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে।
বিডি রহমতুল্লাহর মতে, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করার কারণেই সংকট দিন দিন জটিল হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য থেকে গ্যাস আনা কঠিন হলে সংকটমুক্ত এলাকা বা বিকল্প দেশ যেমন—মালয়েশিয়া, চীন কিংবা ইন্দোনেশিয়া থেকে তেল ও জ্বালানি আনার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। কিন্তু তার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সাহসের প্রয়োজন।’


