বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে ২৬ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এই টাকায় আগামী চার বছরে বাস্তবায়নের জন্য মোট ৬০টি প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের পর্যটন খাতে এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ বিনিয়োগের উদ্যোগ।
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, চোখজুড়ানো পাহাড়ি এলাকা, হাওর এবং সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের মতো আকর্ষণীয় সব স্থান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই সম্ভাবনাকে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অর্জনে রূপান্তর করতে পারছিল না। অবকাঠামোগত ঘাটতি, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, জটিল ভিসা প্রক্রিয়া, অপর্যাপ্ত পর্যটন সেবা এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই পিছিয়ে আছে।
এসব প্রতিকূলতা দূর করতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ২০২৬ থেকে ২০২৯ মেয়াদের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে। এর আওতায় পুরো দেশকে আটটি পর্যটন অঞ্চলে ভাগ করে পাঁচতারকা হোটেল, রিসোর্ট, বিনোদন পার্ক, কেবল কার, হাউসবোট, নৃগোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম, নদীভিত্তিক পর্যটন এবং পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
সরকার আশা করছে, এই পদক্ষেপ অর্থনীতির মূলধারায় পর্যটনের অবদান অনেক বাড়াবে এবং এই খাতে কর্মসংস্থান দ্বিগুণ করে তুলবে।
বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা, পরিসংখ্যান ও প্রশিক্ষণ) মোহাম্মদ জিয়াউল হক হাওলাদার টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, বরং পর্যটনকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাত হিসেবে দাঁড় করানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ কাজ করছেন, যা এই পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রায় ৪৬ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
বর্তমানে পুরো এশিয়া জুড়েই আন্তর্জাতিক পর্যটকদের টানতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন ধরনের পর্যটন সেবা তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আধুনিক পর্যটকরা এখন আর শুধু সুন্দর জায়গা দেখেই সন্তুষ্ট থাকেন না; তারা চান রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, স্থানীয় সংস্কৃতিকে কাছাকাছি থেকে জানা, আধুনিক বিনোদন এবং প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশ।
প্রাকৃতিক সুবিধা থাকলেও অবকাঠামো আর সার্বিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা উন্নত না করলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে পারবে না। মূল চ্যালেঞ্জটি এখন আর দর্শনীয় স্থানের অভাব নয়, বরং সেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ঢাকা অঞ্চল পাচ্ছে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ। এখানে ৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় ১১টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে হাতিরঝিলে কেবল কারসহ এক হাজার ২০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ, মহাখালীতে আড়াই হাজার কোটি টাকার বহুমুখী পর্যটন কেন্দ্র এবং ঢাকার কাছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকায় স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী গ্রাম নির্মাণ অন্যতম।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের ৯টি প্রকল্পের জন্য ৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, যেখানে কক্সবাজারের শৈবাল কম্পাউন্ডে আন্তর্জাতিক পর্যটন সুবিধা ও মহেশখালীতে নতুন প্রকল্প তৈরি করা হবে।
উপকূলীয় ও দ্বীপ অঞ্চলের ৩ হাজার ৫৪০ কোটি টাকার ৬টি প্রকল্পের মধ্যে সোনাদিয়ায় দুই হাজার কোটি টাকার রিসোর্টসহ হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপে নানা উন্নয়ন কাজের পরিকল্পনা রয়েছে।
সিলেট অঞ্চলের ১২টি প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বরশালায় পাঁচতারকা হোটেল ও বিনোদন পার্ক এবং জাফলং, তামাবিল, টাঙ্গুয়ার হাওর, লালাখাল ও হাকালুকি হাওরে ইকো-ট্যুরিজম গড়ে উঠবে।
পার্বত্যাঞ্চলের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, কাপ্তাই ও শুভলংয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুই হাজার ৫০ কোটি টাকা, যেখানে হাউসবোট, কেবল কার ও রোমাঞ্চকর পর্যটন সুবিধা যুক্ত হবে।
এ ছাড়া ইকো-ট্যুরিজমের জন্য খুলনা ও সুন্দরবন অঞ্চল ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটনের জন্য রাজশাহী ও উত্তরাঞ্চল ১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা এবং ময়মনসিংহ অঞ্চল ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা পাচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটক আসার সংখ্যা কতখানি বাড়ল, তারা কতদিন অবস্থান করলেন এবং কত টাকা খরচ করলেন তার ওপর নির্ভর করবে এই বিশাল বিনিয়োগের আসল সার্থকতা।
বর্তমানে একই ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যান্য এশীয় দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক কম বিদেশি পর্যটক পায়। পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই উচ্চমানের পর্যটকদের টানা যাবে না; তার জন্য বিমান যোগাযোগ সহজ করা, দ্রুত ভিসা দেওয়া, বিশ্বজুড়ে প্রচারণা চালানো এবং সেবার মান বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বিনিয়োগ কত কোটি টাকা হলো তার চেয়েও বড় কথা হলো, এই বিনিয়োগ থেকে অর্থনীতিতে কতটা নতুন শক্তি যুক্ত হলো।
পরিকল্পনাটি সফল করতে বড় অঙ্কের বেসরকারি বিনিয়োগ টানাকে মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখছে সরকার। সরকারি অবকাঠামো আধুনিক করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা জানানো হলেও, উদ্যোক্তারা বলছেন বাস্তব চিত্র এখনো কিছুটা জটিল। আইনি প্রক্রিয়ার বিলম্ব, জমি সংক্রান্ত ঝামেলা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং পর্যটকদের চাহিদার অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগে রাখছে। তাদের মতে, সরকারি প্রকল্পগুলোর নকশা এমন হওয়া উচিত যাতে সেগুলোকে কেন্দ্র করে চারপাশে বেসরকারি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ভ্রমণ সেবা সহজেই গড়ে উঠতে পারে।
এই মহাপরিকল্পনায় স্থানীয় সমাজকেও যুক্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পর্যটন এলাকার বেকার যুবক ও নারীদের শেফ, ওয়েটার বা কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি গারো ও মণিপুরিদের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে সাংস্কৃতিক পর্যটনের অংশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃতি রক্ষার পাশাপাশি তাদের সরাসরি আয়ের পথ খুলবে।
প্রস্তাবিত অনেকগুলো প্রকল্পই সুন্দরবন, হাওর, দ্বীপ ও পাহাড়ি অঞ্চলের মতো সংবেদনশীল এলাকায় অবস্থিত। তাই পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, পর্যটনের প্রসার ঘটাতে গিয়ে প্রকৃতির ধারণক্ষমতা যেন পেরিয়ে না যায়। প্রকৃতি রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের আর্থিক লাভ–এই তিনের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রেখে টেকসই পর্যটন গড়ে তোলাই হবে আসল বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।


