যুদ্ধের উত্তেজনা ও কট্টরপন্থী নেতৃত্বের পুনর্গঠনের মধ্যে ইরানে নারীদের হিজাব পরা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক ফের সামনে এসেছে। হিজাবের নিয়ম কতটা কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের সময় সরকারি সমাবেশ ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে অনেক নারীকে হিজাব ছাড়া দেখা গেছে। তখন সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সামনে যুদ্ধসহ বড় সংকট ছিল।
এক ভিডিওতে হিজাব ছাড়া এক নারী ইরানের পতাকা হাতে বলেন, তার স্বামী সামরিক বাহিনীতে কর্মরত। তিনি স্বামীকে নিয়ে গর্বিত বলেও জানান।
তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রক্ষণশীল আলেম ও রাজনীতিকেরা হিজাববিধি কঠোরভাবে কার্যকরের দাবি জোরালো করেছেন। তাঁরা হিজাব না পরাকে ‘জনসম্মুখে অশ্লীলতা’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
অনেক ইরানি নারী প্রকাশ্যে হিজাববিধি অমান্য করছেন। তবে আপাতত বড় ধরনের অভিযান চালাতে সতর্ক কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট ও মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
তবু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হিজাববিধি না মানায় ক্যাফে ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের খবর প্রচার করা হচ্ছে। গত মাসের শেষ দিকে ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সিএনএন অন্তত ছয়টি শহরে এমন ঘটনার তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে তেহরানও রয়েছে।
চার বছর আগে মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন শুরু হয়। পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। পরে আন্দোলনটি কঠোরভাবে দমন করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪ সালের শেষ দিকে জানায়, বাধ্যতামূলক হিজাব আইনের বিরোধিতা করা নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে ইরানি কর্তৃপক্ষ ক্রমবর্ধমান সহিংস দমন অভিযান চালাচ্ছে।
তবে ওই আন্দোলনের প্রভাব এখনো রয়েছে। সরকারি সতর্কতা ও বিচ্ছিন্ন অভিযান সত্ত্বেও বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে হিজাববিধি অমান্যের প্রবণতা ব্যাপক।
মানবাধিকার সংগঠন হরানা জানায়, ১৯ জুলাই তেহরানে বাধ্যতামূলক হিজাববিধি মানতে ব্যর্থ হওয়ায় অন্তত সাতটি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পোশাকবিধি অমান্যের অভিযোগে বন্ধ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের তালিকাও প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
হরানা জানায়, অভিযোগের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ‘নিয়ম লঙ্ঘন’, ‘শালীনতা লঙ্ঘন’ ও ‘ইসলামি শালীনতা না মানা’র মতো অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করছে। চলতি মাসে একটি বুটিক ‘হিজাব না পরার কারণে’ বন্ধ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার তেহরানের প্রসিকিউটর কার্যালয় জানায়, কয়েকটি ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও ‘অপ্রচলিত’ পোশাক বিক্রি করা দোকানে কথিত ‘অশালীনতা’র বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পূর্ব ইরানের দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশে ‘সামাজিক নিয়ম ও বাধ্যতামূলক হিজাববিধি’ লঙ্ঘনের অভিযোগে ১০টি ক্যাফে বন্ধ করা হয়েছে বলে মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রচারে ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্যও গুরুত্ব পাচ্ছে। তারা হিজাবকে ইরানের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে নারীদের শালীন পোশাক পরার আহ্বান জানাচ্ছেন।

তেহরানে জুমার নামাজের ইমাম মোহাম্মদ জাভাদ হাজ আলী আকবারি দাবি করেন, ‘অশ্লীলতা’ ছড়াতে সংগঠিত উদ্যোগ চলছে। কিছু মানুষকে ‘অনুপযুক্ত’ পোশাকে প্রকাশ্যে আসার জন্য অর্থ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
জুনে জনপ্রিয় ইরানি গায়িকা পারাস্তু আহমাদিকে তার ব্যান্ড ও প্রযোজনা দলের আট সদস্যসহ কুমে ৭৪ বার বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়। তাদের দুই বছরের জন্য বিদেশ ভ্রমণেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচার করা এক অনুষ্ঠানে আহমাদি খোলা কাঁধ ও খোলা চুলে উপস্থিত হয়েছিলেন।
তার বিরুদ্ধে ‘সাইবার প্ল্যাটফর্মে অশ্লীল ও অনৈতিক কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশের মাধ্যমে জনশালীনতা লঙ্ঘনের’ অভিযোগ আনা হয়।
কট্টরপন্থীরাও সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। কেহান পত্রিকার সম্পাদক হোসেইন শারিয়াতমাদারি লিখেছেন, হিজাববিধি কার্যকর করা সরকারি কর্মকর্তাদের আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
তেহরান পৌরসভার প্রযোজিত ‘পার্ক ওয়ে’ টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও নারীদের পোশাক নিয়ে কয়েকটি পর্ব প্রচার করা হয়েছে। এসব পর্বে পোশাকবিধি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
হিজাব পরার দাবিতে নারীদেরও সংগঠিত করা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে ইসফাহানে একটি ছোট সমাবেশে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘নেতানিয়াহু, হিজাববিহীন নারীরা বিনা মূল্যে আমাদের সৈনিক।’
নেতানিয়াহু এমন মন্তব্য করেছেন, এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে স্লোগানটি ইরানের কট্টরপন্থীদের প্রচারিত একটি বক্তব্য তুলে ধরে। তাঁদের দাবি, হিজাব না পরা নারীরা দেশের প্রতি অনুগত নন।
তবে সরকারি প্রচারণায় অনেক নারী যে ভয় পাচ্ছেন না, তারও প্রমাণ রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেলমেট পরা, কিন্তু হিজাব না পরা তরুণীদের স্কুটার চালানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। নারীদের মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সরকার এখনো বাস্তবায়ন করেনি।
ভিডিওতে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে তরুণীদের দলবদ্ধভাবে স্কুটার চালাতে দেখা যায়। ইনস্টাগ্রামের একটি পোস্টে একদল নারী বলেন, ‘আমরা শিরাজের মোটরসাইকেল গার্লস! শিরাজের মেয়েরা, চল।’
ইনস্টাগ্রামের আরেক অ্যাকাউন্টে ইসফাহানে প্রায় ২০ নারী মোটরসাইকেল চালকের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এটিকে ‘ইসফাহানে নারীদের সবচেয়ে বড় মোটরসাইকেল আয়োজন’ বলা হয়েছে।
যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে হিজাব নিয়ে কঠোর অবস্থানকে অনেকেই সরকারের ভুল অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও এমন অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এক রক্ষণশীল আলেমের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আলেম হিজাবের কথা বলেছেন। এলাকায় ও মসজিদে কাজ করুন। আইন করে মানুষের আচরণ কি সত্যিই বদলানো যায়?’
পেজেশকিয়ান বলেন, তার মেয়ে কখনো কখনো তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তার মানে কি আমাকে তাকে জোর করতে হবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘আচরণ পরিবর্তন একটি সাংস্কৃতিক বিষয়। এটি বিশ্বাসের বিষয়। জোর করে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করা যায় না।’
সাবেক সংসদ সদস্য গোলামালি জাফারজাদেহ ইমানাবাদি বলেন, হিজাবের বদলে কর্মকর্তাদের মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার দিকে নজর দেওয়া উচিত।
একটি অনানুষ্ঠানিক গণমাধ্যমও ‘যুদ্ধক্লান্ত জনগণকে উসকানি: হিজাব টহল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ফেরানোর নেপথ্যে কী?’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানি কর্তৃপক্ষ নারীদের হিজাব পরতে উৎসাহিত করতে শুরু করে। এর আগে রাজতন্ত্র নারীদের তুলনামূলক ধর্মনিরপেক্ষ ও পশ্চিমাপন্থী ভাবমূর্তি প্রচার করত।
ইরানের ইসলামি দণ্ডবিধির ৬৩৮ ধারায় ‘ইসলামি হিজাব’ ছাড়া নারীদের জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে আইনে ‘ইসলামি হিজাব’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
২০২৪ সালে অনুমোদিত আরও কঠোর আইনে শাস্তি ও নজরদারির বিস্তৃত ব্যবস্থা চালুর কথা ছিল। তবে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের হস্তক্ষেপের পর আইনটির বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়।
এতে কট্টরপন্থীরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য মোহাম্মদ-তাকি নাকদালি বলেন, ‘ইসরায়েল ও আমেরিকা আমাদের ধ্বংস করতে পারবে না। কিন্তু ধর্মীয় সংস্কৃতিকে গ্রাস করা এই অবক্ষয় ও সমাজে ছড়িয়ে পড়া অশ্লীলতা আমাদের ধ্বংস করতে পারে।’
তবে আপাতত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ইরানি সরকার।
তেহরানের ষাটোর্ধ্ব এক নারী বলেন, ‘তারা এখনো রাস্তায় মানুষকে কিছু বলার সাহস করে না। তেহরানের মেয়েরা খোলামেলা পোশাক, শর্টসসহ নানা পোশাক পরে বাইরে ঘুরছে। মাথার ওড়না প্রায় আর দেখাই যায় না।’
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না তারা আবার এসব মেয়েকে হিজাব পরাতে পারবে। তবে বিপ্লবের সময়ও আমরা এমনটাই ভেবেছিলাম। কখনো ভাবিনি তারা আমাদের হিজাব পরতে বাধ্য করতে পারবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা তা করেছিল।’
সূত্র: সিএনএন


