নয় বছর অনেক দীর্ঘ সময়। এই সময়ে পর্দা বদলায়, মুখ বদলায়, প্রজন্ম বদলায়। কিন্তু কিংবদন্তি কি এত সহজে মুছে যায়? নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুর নয় বছর পর প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ফিরে আসে—যে মানুষটি নিজের অভিনয়, নির্মাণ আর শ্রমে ঢাকাই চলচ্চিত্রের একটি যুগ তৈরি করেছিলেন, তাকে কি আমরা যথেষ্ট মনে রেখেছি?
নায়ক রাজ রাজ্জাকের পরিবারের কাছে এখন এই প্রশ্নের গুরুত্ব অনেকটাই কমে গেছে। তার ছেলে খালিদ হোসেন সম্রাট জানান, একসময় তার মনে কষ্ট হতো, চলচ্চিত্রশিল্প তাঁর বাবাকে মনে রেখেছে কি না, তা ভেবে। এখন আর তিনি এসব ভাবেন না।
সম্রাট বলেন, ‘আব্বা চলে যাওয়ার নয় বছর হয়ে গেছে। তিনি আমার বাবা, তাই পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা প্রতি বছরই তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। কিন্তু একটা সময় মন খারাপ হতো, চলচ্চিত্র পরিবার বা ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে মনে রেখেছে কি না, তা ভেবে। এখন আর এসব ভাবি না। আমরা শুধু সবার কাছে আব্বার জন্য দোয়া চাই। আমি বিশ্বাস করি, তাঁর ভক্ত ও দর্শকদের হৃদয়ে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকবেন।’
২০১৭ সালের ২১ আগস্ট বাংলা চলচ্চিত্র হারায় এমন এক অভিনেতাকে, যার কণ্ঠ ও হাসি প্রায় পাঁচ দশক ধরে এ দেশের চলচ্চিত্রের কেন্দ্রজুড়ে ছিল। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম আবদুর রাজ্জাকের। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি ছিল তার আগ্রহ। দেশভাগের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এরপর শুরু হয় চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সংগ্রাম।
পাকিস্তান টেলিভিশনের ধারাবাহিক ‘ঘরোয়া’ দিয়ে প্রথম পরিচিতি পান রাজ্জাক। পরে চলচ্চিত্রকার আবদুল জব্বার খানের সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। বড় পর্দায় তার যাত্রা শুরু ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’ দিয়ে। এরপর অভিনয় করেন ‘কার বউ’, ‘ডাকবাবু’ ও ‘আখেরি স্টেশন’-এ। জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে সুচন্দার বিপরীতে অভিনয় করে নায়ক হিসেবে বড় ধরনের সাফল্য পান তিনি।
পরবর্তী সময়ে জহিরুল হক পরিচালিত ‘রংবাজ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রযোজনায় আসেন রাজ্জাক। ১৯৭৭ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ছবিটিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন ববিতা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন তিনি। বাংলাদেশের পাশাপাশি কলকাতা ও উর্দু চলচ্চিত্রেও তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে।
অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পান রাজ্জাক। ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে এই পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। ২০১৩ সালে পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা। ২০১৫ সালে তাকে দেওয়া হয় স্বাধীনতা পুরস্কার।
নায়করাজের নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের। কিন্তু চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনের মধ্যে পরিচালক সমিতি ছাড়া কারো পক্ষ থেকে এ উপলক্ষে আয়োজনের কোনো খবর নেই। যে মানুষটি তার জীবনের প্রায় পুরোটা সময় এই শিল্পের পেছনে দিয়েছেন, তার মৃত্যুবার্ষিকীতে এই নীরবতা তাই সহজে চোখ এড়িয়ে যায় না।
কারণ নায়করাজ শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতীক। তার অভিনয়ের সঙ্গে বদলেছে দর্শকের রুচি। তার উপস্থিতির সঙ্গে বদলেছে নায়ক হওয়ার সংজ্ঞা। তার হাত ধরে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা ও পরিচালনাতেও তৈরি হয়েছে নতুন পথ।
একটি চলচ্চিত্রশিল্প শুধু নতুন ছবি, নতুন তারকা কিংবা নতুন সাফল্যে বেঁচে থাকে না। তার শেকড়ও মনে রাখতে হয়। যারা সেই শেকড় তৈরি করেছেন, তাদের স্মরণ করাও শিল্পের দায়িত্ব।
নয় বছর পর তাই প্রশ্নটি শুধু নায়করাজকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের চলচ্চিত্রের স্মৃতিবোধ নিয়েও।
আমরা কি সত্যিই মনে রেখেছি সেই মানুষটিকে, যিনি নিজের জীবন দিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রের একটি যুগ নির্মাণ করেছিলেন? নাকি ধরে নিয়েছি, নায়করাজ এমন এক নাম, যাকে আলাদা করে মনে করিয়ে দেওয়ার আর প্রয়োজন নেই?
রাজ্জাক হয়তো সত্যিই বেঁচে থাকবেন তার ভক্ত-দর্শকের হৃদয়ে। কিন্তু একটি শিল্প তার কিংবদন্তিদের কতটা যত্নে স্মরণ করে, তার মধ্যেই তো সেই শিল্পের নিজের ইতিহাসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
নয় বছর পর রাজা নেই। প্রশ্ন হলো, ‘রাজাকে ছাড়া ঢালিউড কি তার রাজাকে মনে রেখেছে?’


