আগে আশ্বাস দেওয়া হলেও চলতি মাসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি আগামী সেপ্টেম্বরেও জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করা যাবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট চলছে, লোডশেডিং পৌঁছেছে প্রায় ৪,০০০ মেগাওয়াটে। বিদ্যুতের এমন তীব্র ঘাটতিতে জন দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এই বিপদের দিনে রূপপুর থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এলে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেত। আর ঠিক তখনই এলো রূপপুরের এই হতাশাজনক খবর।
গত ২৮ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি বা রড লোড করার কাজ শুরু হয়। তখন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের মধ্যেই ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
এরপর ১২ জুন পাবনার ঈশ্বরদীতে এক বৈঠকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, আগস্টের শেষ নাগাদ এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তিনি আরও জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে পুরোদমে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, আগস্টের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। তিনি বলেন, “আগস্টে এটি সম্ভব নয়। জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে দিতে সেপ্টেম্বর হয়ে যেতে পারে, তবে সেটাও এখনও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।”
তিনি জানান, প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি ভরাসহ প্রাথমিক নিরাপত্তার পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগের সবচেয়ে জরুরি ধাপ, অর্থাৎ ‘ক্রিটিক্যালিটি’ বা মূল চালু করার পর্যায়ে এটি এখনও পৌঁছায়নি।
এই ধাপে যেতে হলে প্রথমে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) অনুমোদন লাগবে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) ইতিমধ্যে তাদের সব পরীক্ষার তথ্য বায়েরার কাছে জমা দিয়েছে। বায়েরা এগুলো যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সবুজ সংকেত দেবে।
এনপিসিবিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হাসান ‘টাইমস’কে বলেন, “বিষয়টি এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বায়েরা পরীক্ষার ফল দেখে অনুমোদন দিলে আমরা পরের ধাপে যাব।”
কবে থেকে বিদ্যুৎ চালু হতে পারে—জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাননি। জাহিদুল হাসান বলেন, “এটুকু বলতে পারি, আমরা প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একেবারে শেষ ধাপে আছি। তবে আমাদের কাছে নিরাপত্তাই সবচেয়ে আগে।”
তিনি জানান, পারমাণবিক কেন্দ্র চালু করতে হলে ধাপে ধাপে অনেকগুলো পরীক্ষা পার হতে হয়। একটি ধাপ সফল হলে তবেই পরের ধাপে যাওয়া যায়। তার কথা থেকে ইঙ্গিত মেলে, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে আরও ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুই হাজারটিরও বেশি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। প্রথম ইউনিটটি এখন বি-১ ও বি-২ ধাপে রয়েছে। বি-১ ধাপের ৯৯টি পরীক্ষার সবই শেষ হয়েছে, আর বি-২ ধাপের ১৮টি পরীক্ষা বাকি। বি-২ ধাপ শেষ হলে কেন্দ্রটি ‘সি’ ধাপে যাবে, আর তারপরই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে।
জাহিদুল হাসান জানান, বি-২ ধাপের জন্য সাধারণত দুই সপ্তাহ এবং সি-২ ধাপের জন্য আরও চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগে।
রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট’ এটি তৈরি করছে। পুরো কেন্দ্র চালু হলে এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ মেটাতে পারবে।
সাধারণ জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে রূপপুর থেকে কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হলেও, বিদ্যুতের দর কত হবে তা সরকার এখনও চূড়ান্ত করেনি।
মন্ত্রণালয়ের ঐ কর্মকর্তা বলেন, “বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকারী রুশ প্রতিষ্ঠান ‘রোসাটম’-এর সঙ্গে দাম নিয়ে আলোচনা এখনও শেষ হয়নি।”
কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুতে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে দেরি হওয়ার কারণে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে পুরো ১,২০০ মেগাওয়াট পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও পিছিয়ে যেতে পারে। এতে চূড়ান্ত সময়সীমা অন্তত এক মাস পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
তবে জাতীয় গ্রিড রূপপুরের বিদ্যুৎ নেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে বলে তারা নিশ্চিত করেছেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গত বুধবার ‘টাইমস’কে বলেছিলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে তিনি বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করবেন। তবে পরে বৃহস্পতিবার ও শনিবার তাকে ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।


