ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কয়েকজনের মোবাইল ফোন তল্লাশি ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ঠিক দুই বছর আগেই একই জায়গায় সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন তল্লাশি, আটকে রাখা ও হেনস্তার ঘটনায় তীব্র সমালোচনা করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়কেরা। তখন ফোন চেকের ঘটনাকে ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন’ এবং মানুষের ওপর হামলাকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ বলেছিলেন তারা।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় একই কায়দায় মানুষের ফোন তল্লাশি করে সমালোচিত হতো দলটির ভাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাত্রলীগ। কিন্তু তারা এসব সমালোচনার ধার ধারেনি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার দিবস শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের প্রবেশমুখে ঘটনাটির সূত্রপাত। সেখানে এক রিকশাচালক মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর সদস্যসচিব পরিচয় দেওয়া আ ন ম আয়াস তার কাছে গিয়ে মোবাইল ফোন তল্লাশি করেন।
আয়াসের অভিযোগ, ওই রিকশাচালক ধারণ করা ভিডিও যুবলীগের এক নেতার কাছে পাঠিয়েছেন। এ অভিযোগের পর আয়াসের সঙ্গে থাকা কয়েকজন রিকশাচালককে মারধর শুরু করেন। পরে সেখানে উত্তেজনা তৈরি হলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং রিকশাচালককে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যায়।
আয়াস সংবাদকর্মীদের প্রশ্নে বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা যাতে কোনো ‘অপতৎপরতা’ চালাতে না পারে, সে জন্য তারা ধানমন্ডি ৩২ এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
তবে ওই ব্যাক্তির মোবাইল ফোন তল্লাশির আইনগত ভিত্তি কী ছিল, সে বিষয়ে আয়াস কোনো বক্তব্য দেননি।
আইন কী বলছে
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া স্পষ্ট করে বলেন, আদালতের অনুমতি ছাড়া কারও ফোন তল্লাশির অধিকার অন্য কারও নেই।
তিনি ব্যাখা করেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকের চিঠিপত্র ও যোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যমের গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। মোবাইল ফোন বর্তমানে ব্যক্তিগত যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হওয়ায় এর ভেতরের তথ্যের গোপনীয়তার প্রশ্নও এ অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কারও অনুমতি ছাড়া তার ডিজিটাল ডিভাইসে প্রবেশ করা বা ব্যক্তিগত তথ্য দেখা উল্টো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও জানান তিনি।
দণ্ডবিধির ৫০৩ ধারা তুলে তিনি বলেন, ‘ভয়ভীতি দেখিয়ে কাউকে এমন কিছু করতে বাধ্য করা, যা তিনি আইনত করতে বাধ্য নন, তা অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের আওতায় পড়তে পারে।’
দুই বছর আগে সমন্বয়করা কী বলেছিলেন
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ১০ দিন পর ১৫ আগস্ট ঘিরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে একই ধরনের উত্তেজনা ছিল।
সে সময় পুড়ে যাওয়া ভবনটি ঠাঁয় দাঁড়িয়েছিল। তবে সেখানে যেন কেউ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য যেতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে একদল মানুষ তা ঘেরাও করে রাখে। তারা সেই সড়কের পাশেপাশে দিয়ে চলাচলকারীদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন পরীক্ষা করছিল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সে সময়ের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজেও ফেসবুকে এসব কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে ছাত্রলীগের উদাহরণ টেনেছিলেন।
তিনি সে সময় লেখেন, ‘ছাত্রলীগ ফোন চেক করলেও তা প্রাইভেসি লঙ্ঘন, আপনারা আজকে যেটা করলেন সেটাও প্রাইভেসি লঙ্ঘন। তিনি বলেছিলেন, যে-ই প্রাইভেসি লঙ্ঘন করবে, তার বিরুদ্ধেই তাদের অবস্থান থাকবে।’
বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সে সময়কার সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ছিল, ‘গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের গণমাধ্যমে খারাপভাবে উপস্থাপন করাও মানবাধিকার লঙ্ঘন, এবং অভিযুক্তদের বিচার হতে হবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই। কারণ, আন্দোলনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ন্যায়, নীতি ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে।’
সমন্বয়ক সারজিস আলমও মানুষের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনাকে তিনি ‘গণঅভ্যুত্থানের চেতনার’ সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছিলেন।
ছাত্রলীগ কী করত
২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলন চলাকালে শাহবাগ থানার বিপরীতে হেলমেট পরে লাঠিসোঁটা হাতে অবস্থান নিতে দেখা গিয়েছিল ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের।
শাহবাগে পুলিশের ব্যারিকেডের কাছে বিভিন্ন মানুষকে ঘিরে ধরে মোবাইল ফোনের লক খুলে চেক করার অভিযোগ ছিল। কোটা আন্দোলনকারী সন্দেহে যাদের ফোনে ‘সন্দেহজনক’ কিছু পাওয়া যেত, তাদের চড়-থাপ্পড় মেরে টেনেহিঁচড়ে থানা চত্বরে নিয়ে যাওয়া হতো–সে সময় শাহবাগে অন্তত শতাধিক পুলিশ ও আনসার সদস্য উপস্থিত থাকলেও তা ঠেকানো হতো না বলে অভিযোগ।
নির্দিষ্ট কিছু ঘটনায়, যেমন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সন্দেহভাজনদের মোবাইল ফোন তল্লাশি করে করে থানায় সোপর্দ করার অভিযোগ সে সময়কার সংবাদমাধ্যমে এসেছিল।
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরে সেই একই কায়দায় মানুষের গোপনীয়তা লঙ্ঘন দেখে অনলাইন এক্টিভিস্ট মির্জা হাসিব হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ফোন চেক করার অধিকার কারও নেই—এমনকি পুলিশেরও নেই, আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া।’
রিকশাচালক নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হলেও তার মৌলিক অধিকার কেউ হরণ করতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ঘটনাস্থলে মোবাইল ফোন তল্লাশি, ব্যক্তিকে আটকে রাখা এবং মারধরের অভিযোগের পর যারা এতে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সে প্রশ্নে ধানমন্ডি থানার ওসি মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম বলেন টাইমসকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


