ব্যাংকিং খাত দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ১৭ কোটির বেশি হিসাব, ৬২টি তফসিলি ব্যাংক ও ১২ হাজারের বেশি শাখার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল লেনদেন হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৩১১ লাখ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে নগদে ২০৯ লাখ কোটি ও ডিজিটাল মাধ্যমে ১০২ লাখ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ মোট লেনদেনের প্রায় ৬৭ শতাংশই হয়েছে নগদে।
ব্যাংকিং কার্যক্রমের প্রতিটি স্তরে পরিবেশবান্ধব চর্চা যুক্ত হলে এর প্রভাব হবে কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা এই রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করেছে। ব্যাংকগুলোকে মোট মেয়াদি ঋণের অন্তত ৫ শতাংশ গ্রিন ফাইন্যান্স এবং ২০ শতাংশ টেকসই খাতে বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রিন ব্যাংকিং শুধু নীতিমালা বা ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও এর প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
চলতি আগস্ট মাস থেকে এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ভৈরব শাখা নগদ টাকা লেনদেনে কাগজের খাম বা পলিথিনের ব্যাগের বদলে গ্রাহকদের দেশীয় পাট ও কাপড়ে তৈরি নান্দনিক, টেকসই ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ দিচ্ছে।
অপচনশীল পলিথিনের দূষণ ও বৃক্ষনিধনের অনুঘটক কাগজের খামকে এক বাক্যে ‘না’ বলে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের মাধ্যমে শাখাটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। প্রতিটি লেনদেনে যুক্ত হচ্ছে পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার।
ছোট এই পরিবর্তন প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় একটি দায়িত্বশীল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। উদ্যোগটি বড় একটি বার্তা দিচ্ছে। পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং নীতিগত প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দৈনন্দিন প্রয়োগের বিষয়। উদ্যোগটি পরিবেশগত দায়বদ্ধতা, অর্থনৈতিক যুক্তি ও স্থানীয় সম্পদনির্ভরতার সমন্বিত প্রয়াস।
এই কার্যক্রম ইতোমধ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন। তিনি এটি বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তার অবস্থান থেকে পাটভিত্তিক বিকল্প ব্যবহারে সরকারি উৎসাহ ও নীতিগত সহায়তা আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে এ ধরনের উদ্যোগের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এটি গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ায়। পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অনুপ্রাণিত করে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার বাস্তব প্রয়োগ হিসেবেও এটি একটি ইতিবাচক উদাহরণ।
টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে সেতুবন্ধন প্রয়োজন। এনআরবিসি ব্যাংকের ভৈরব শাখার উদ্যোগ সেই সেতুবন্ধনের ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। যথাযথ প্রণোদনা ও প্রসার ঘটলে এটি দেশের আর্থিক খাতে পরিবেশবান্ধব চর্চার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।
পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহার সম্প্রসারণে রাষ্ট্রীয় নীতিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনিসহ ছয়টি পণ্যের মোড়কীকরণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দেশনা পরিপালন না করলে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকঋণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, পরিবেশবান্ধব মোড়ক ব্যবহারের বিষয়টি এখন পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের শর্ত।
একই ধারাবাহিকতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় এক কোটি সাত লাখ শিক্ষার্থীর জন্য পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ ও জুতা সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েও কাজ চলছে। এর বাস্তবায়ন পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি পাটচাষি, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
পলিথিন নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অবস্থানও ঐতিহাসিক। ২০০২ সালে দেশে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশও পরে একই পথে এগিয়েছে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ইতালি প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করে। নিষেধাজ্ঞার আগে দেশটি বিশ্বের সর্বাধিক প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারকারী দেশগুলোর অন্যতম ছিল।
এসব অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে। সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন ও উপযুক্ত বিকল্প নিশ্চিত করা গেলে মানুষের দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক অভ্যাসেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।
পাট একটি প্রাকৃতিক তন্তু। এটি সম্পূর্ণ জৈব-বিয়োজ্য ও পরিবেশের জন্য নিরাপদ। পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষিপণ্যের একটি। এর উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ দেশের অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
কাপড়ের ব্যাগও দীর্ঘস্থায়ী ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য। এটি একবার ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক।
প্রাথমিকভাবে পাট বা কাপড়ের ব্যাগের খরচ পলিথিন ব্যাগ বা কাগজের খামের তুলনায় বেশি মনে হতে পারে। একটি সাধারণ পলিথিন ব্যাগের খরচ আনুমানিক ২ থেকে ৩ টাকা। কাগজের খামের খরচ ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বিপরীতে, একটি পাট বা কাপড়ের ব্যাগের খরচ ৩০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে হতে পারে। প্রথম নজরে এটি তুলনামূলক বেশি।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যবহারকাল। পলিথিন ব্যাগ সাধারণত একবারই ব্যবহারযোগ্য। কাগজের খামও অধিকাংশ ক্ষেত্রে একবার ব্যবহারের পর অকার্যকর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পাট বা কাপড়ের ব্যাগ বহুবার ব্যবহার করা যায়। ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী এগুলো প্রায় ২০ থেকে ৫০ বার পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব।
গড় হিসাবে একটি পাটের ব্যাগ ৩০ বার ব্যবহার করা যায়। সে হিসাবে প্রতি ব্যবহারে খরচ দাঁড়ায় মাত্র ১–২ টাকা। এটি পলিথিন ব্যাগের সমপর্যায়ের বা তারও কম। এতে দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি ব্যয়সাশ্রয়ী সমাধান।
এ ছাড়া, পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি দেশের স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহিত করে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাও বাড়ায়। ফলে এই উদ্যোগের অর্থনৈতিক সুফল শুধু ব্যাংকের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বৃহত্তর অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ব্যাংক একটি জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান। গ্রাহকদের আচরণে প্রভাব ফেলার সক্ষমতা ব্যাংকের রয়েছে। এনআরবিসি ব্যাংকের ভৈরব শাখার পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রাহকদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে টেকসই অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ, ব্যয় সাশ্রয় ও দেশীয় শিল্পের উন্নয়নের সমন্বয়ে এই উদ্যোগ টেকসই ব্যাংকিংয়ের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
লেখক: ব্যবস্থাপক, ভৈরব শাখা ও এরিয়া ইনচার্জ, কিশোরগঞ্জ এরিয়া, এনআরবিসি ব্যাংক।


