দেশের ব্যাংকিং খাতে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চলবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। একই সঙ্গে ব্যাংকিং কার্যক্রমে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘১ কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য: চট্টগ্রাম অঞ্চলের সম্ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
এ সময় ব্যাংকগুলোতে শনাক্ত হওয়া অনিয়মের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করে পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকদের নির্দেশ দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’
কর্মকর্তাদের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে নীল অর্থনীতি, সামুদ্রিক সম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম তন্তুসহ উচ্চ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান মোস্তাকুর রহমান।
গভর্নর আরও বলেন, ‘বিদেশের নির্দিষ্ট শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রধানত অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ওপর নির্ভর করা যাবে না। এ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে।’
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে মো. মোস্তাকুর রহমান কর্মকর্তাদের ডিজিটাল লেনদেন ত্বরান্বিত করতে এবং নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে দেশকে এগিয়ে নিতে বাংলা কিউআর-এর ব্যবহার সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন।
বিদেশের নির্দিষ্ট শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে পাঠানোর ওপর জোর দেন মো. মোস্তাকুর রহমান। অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানান গভর্নর।
এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ মিয়া। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহমেদ এবং প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপস্থাপিত একটি ধারণাপত্রে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামষ্টিক অর্থনীতি, শিল্প খাত ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হয় এবং তা মোকাবিলায় সম্ভাব্য পদক্ষেপের কথা বলা হয়।
ধারণাপত্র অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ২০০টি কারখানা বন্ধ রয়েছে অথবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে, প্রায় পাঁচ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। একই সময়ে, এ অঞ্চলে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা খেলাপি ও অনাদায়ী ঋণ জমা হয়েছে।
ধারণাপত্রে আরও বলা হয়, এসব কারখানা পুনরায় চালু করা গেলে প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন বাড়বে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব হবে। তবে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের অপর্যাপ্ততা এবং দক্ষ শিল্পকর্মীর ঘাটতিসহ বেশ কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে ধারণাপত্রে অব্যবহৃত শিল্পজমির বিকল্প ব্যবহার, আইনি জটিলতার সমাধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উপযুক্ত নীতিগত সহায়তার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ধারণাপত্র অনুযায়ী, দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ, আমদানির ২১ শতাংশ, রেমিট্যান্সের ২৮ শতাংশ, আমানতের ১৯ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং মোট ব্যাংক ঋণের ১৮ দশমিক পাঁচ শতাংশ এ অঞ্চল থেকে আসে।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহমেদ বলেন, ‘চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে তিনি আঞ্চলিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আর্থিক ও আয় বৈষম্য কমানো, সম্পদের আরও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তার জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা সম্প্রসারণেরও আহ্বান জানান।


