জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর থেকে নতুন যাত্রাপথের শুরু এবং পথ হারিয়ে ফেললে এখানেই পথ খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন স্মৃতি জাদুঘর থেকে নতুন যাত্রাপথ রচনা হবে। আমরা পথ হারিয়ে ফেললে এখানে এসে পথ খুঁজে নেব। যদি আমাদের চিন্তায় কোনো গাফিলতি আসে, আমরা এখানে তার ঠিকানা বের করব। আমরা নতুন সূত্রে আবার যাত্রাপথ শুরু করব।’
বুধবার সকালে শেরেবাংলা নগরে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মুহাম্মদ ইউনূস এসব কথা বলেন।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আজকের এই দিন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর নানা দেশে নানা রকমের জাদুঘর আছে, যারা অতীতের অনেক জিনিস সংগ্রহ করে বিশেষ বিশেষ জিনিস জাতির কাছে তুলে ধরার জন্য। কিন্তু এই জাদুঘরটি ভিন্ন। এখানে অতীতের কিছু সংগ্রহ নেই।’
তিনি বলেন, ‘এখানে একেবারে টাটকা, নতুন যা ঘটনা ঘটেছে, তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। এ রকম জাদুঘর আছে কি না জানি না। কিন্তু আমাদের সুযোগ হলো ঘটনা ঘটেছে–সেই ঘটনার প্রতিটি নমুনা, প্রতিটি ইতিহাস আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করতে পেরেছি এবং এই স্মৃতি জাদুঘরে নিয়ে এসেছি।’
‘এটা আমাদের ইতিহাসের একটা নতুন পর্যায় সৃষ্টি করেছে। অতীত এবং ভবিষ্যৎ–এই দুইয়ের মাঝামাঝিতে এই জাদুঘর। এই জাদুঘর তাৎক্ষণিকভাবে অতীতকে ধারণ করেছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ রচনা করেছে। আমরা কারা, কী চাই, আমাদের মনে কী ছিল?’ যোগ করেন তিনি।
শহীদ আনাসের চিঠি তুলে ধরে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা গেলাম, আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চলে গেলাম। এই হচ্ছে জাদুঘরের বৈশিষ্ট্য।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাদুঘরটিতে সর্বস্তরের মানুষ আসবে–প্রত্যাশা ব্যক্ত করে ইউনূস বলেন, ‘এটা এমন এক জাদুঘর যে, বাংলাদেশের যত তরুণ-তরুণী, যত নাগরিক আছেন, সবার যেন অন্তত একবার দেখার সুযোগ হয়। প্রতিদিন দলে দলে আসবে, দেখবে, নিজের মনের কথা লিখে রাখবে, নিজের মনের কথা লিখে জমা দিয়ে যাবে এখানে। তার মধ্যে কী আবেগ এসেছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে কী চিন্তা করে, সেটা লিপিবদ্ধ করে দিয়ে যাবে।’
জুলাই অভ্যুত্থানে রাজপথে নেমে আসা জনগণের কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘তারা আমাদেরই বন্ধু-বান্ধব, আমাদেরই ছেলেমেয়ে, আমাদেরই প্রতিবেশী। কোনো বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক কর্মী নন তারা। তারা সাধারণ ছেলেমেয়ে, যারা রাজপথে নেমে এসেছে। তারা চেয়েছিল যে, এই বাংলাদেশ আর এভাবে চলবে না, আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ব—এটা ছিল তাদের আশা।’
ইউনূস আশা প্রকাশ করে বলেন, সারা দেশের সব জায়গা থেকে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা এখানে আসবে। একটা দিন এখানে কাটাবে এবং তাদের মনের কথা লিখে দিয়ে যাবে যে ‘আমি কী চাই? আমার কী চাহিদা, আমি কী কাজে নিজেকে নিয়োজিত করছি’ সেটা জানিয়ে যাবে। এটা সারা দেশের সকল সংস্কৃতির একটা মিলনভূমি হবে।
জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনাকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আজকে আমরা কয়েক মিনিটে ঘুরে দেখেছি। কিন্তু এর প্রতিটি জিনিস সংগ্রহ করতে বহু সময় লেগেছে, বহু কষ্ট হয়েছে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের ফলক উন্মোচন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরটি ঘুরে দেখেন এবং আলোচনা সভায় যোগ দেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতি ও তথ্য-সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এবং সংস্কৃতি সচিব কানিজ মাওলা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ্জোহরা, শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং জুলাই যোদ্ধা নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তিও বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম, মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, সংসদের প্রধান হুইপ, সংসদ সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, বিভিন্ন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, কূটনীতিক, বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদসহ সরকারি ও বেসরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জাইমা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।


