আজম খান: মুক্তিযোদ্ধা থেকে পপ সম্রাট

আজম খান: মুক্তিযোদ্ধা থেকে পপ সম্রাট
পপগুরু আজম খান
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশি পপ সংগীতের ইতিহাসে তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি একটি সংস্কৃতির নাম, একটি বিপ্লবের প্রতীক। তিনি গুরু আজম খান। সত্তরের দশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে পশ্চিমা পপ ধারার সাথে এ দেশীয় মাটির সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে যিনি বাংলা পপ সংস্কৃতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তাকে যথাযোগ্যভাবেই আখ্যা দেওয়া হয় ‘পপ সম্রাট’ বা ‘গুরু’ হিসেবে।

আজম খানের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে। তরুণ বয়সেই তার ভেতরে এক দ্রোহী সত্তার জন্ম নেয়, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। ২ নম্বর সেক্টরের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি সেকশন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকার অদূরে ত্রাস সৃষ্টি করা বেশ কয়েকটি দুঃসাহসিক গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন।

দেশ স্বাধীনের পর আজম খান বন্দুক ছেড়ে হাতে তুলে নেন গিটার। যুদ্ধের ময়দানের সেই ক্ষোভ, স্বপ্নভঙ্গ আর নতুন দেশ গড়ার তাড়না তিনি ঢেলে দেন গানের সুরে। ১৯৭২ সালে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ঐতিহাসিক ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। বিটিভিতে ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই থাকবে না রে’ এবং ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি সম্প্রচারিত হওয়ার পর রাতারাতি দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়।

তার গানগুলো ছিল একেবারেই সাধারণ মানুষের কথা। কোনো জটিল শব্দের ব্যবহার নয়, বরং সহজ-সরল ভাষায় সমসাময়িক বাস্তবতাকে তিনি তুলে ধরতেন। তার কিছু কালজয়ী গান আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দোলা দেয়—‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘রেলেলাইনের ওই বস্তিতে’, ‘পাপড়ি কেন বোঝে না’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’।

‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ গানটিতে তিনি যেভাবে যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও নির্মম বাস্তবতাকে ফুটিয়ে পাঠিয়েছিলেন, তা তৎকালীন তরুণ সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

আরও পড়ুন

আজম খানকে আমরা মূলত গায়ক হিসেবে চিনলেও, তার ক্যারিয়ারে অভিনয়ের একটি দারুণ ও বৈচিত্র্যময় অধ্যায় রয়েছে। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জনপ্রিয় নাট্য সিরিজ ‘হীরামন’-এর ‘কালা বাউল’ পর্বে তিনি একজন বাউল শিল্পীর চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের চমকে দেন। তার সেই সহজাত অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০০৩ সালে শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় এক দুর্দান্ত খলচরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। একজন পপ সংগীতশিল্পীর পর্দায় এমন দুর্ধর্ষ নেতিবাচক চরিত্রে হাজির হওয়া ছিল বেশ সাহসী এবং ব্যতিক্রমী এক সিদ্ধান্ত। শুধু নাটক বা সিনেমাই নয়, নব্বই ও ২০০০-এর দশকে বেশ কিছু বিজ্ঞাপনেও মডেল হিসেবে দেখা গেছে তাকে। বিশেষ করে আইয়ুব বাচ্চুর সাথে করা ‘বাংলালিংক’-এর ‘দিন বদল’ প্রচারণার বিজ্ঞাপনটি এখনো মানুষের মনে দাগ কেটে আছে।

আজম খানের গায়কী ও পরিবেশনা ছিল একদম আলাদা। মঞ্চে তার পারফরম্যান্স, মাথার ঝাঁকড়া চুল, আর চলন-বলনের মাঝে এক ধরণের আদিম ও অকৃত্রিম শক্তি ছিল। কোনো কৃত্রিমতা বা তারকাখ্যাতির অহংকার তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তীব্র জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও তিনি আজীবন কাটিয়েছেন অত্যন্ত সাধারণ এক মানুষের মতো। ঢাকার কমলাপুরের অতি সাধারণ জীবনযাপনই ছিল তার পরম পছন্দ।

২০১১ সালের ৫ জুন এই মহান শিল্পী ও মুক্তিসেনানী না-ফেরার দেশে চলে যান। মরোণোত্তর তাকে ‘একুশে পদক’ ও ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad