বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী মাজারের ‘ঠাকুর দিঘি’র একমাত্র কুমিরটির একের পর এক আক্রমণের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গতা, তীব্র খাদ্যসংকট ও অনুকূল পরিবেশ না থাকায় কুমিরটি ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন প্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
সব শেষ সোমবার রাতে দিঘিতে গোসল করতে নামা ফাতেমা আক্তার (৭) নামের এক শিশুকে টেনে নিয়ে যায় কুমিরটি। মঙ্গলবার ভোরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
খলিফাতাবাদ জনপদের প্রতিষ্ঠাতা আধ্যাত্মিক সাধক খানজাহান আলী এই অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানির ব্যবস্থার জন্য প্রায় ২০০ একর আয়তনের এই বিশালাকৃতির দিঘিটি খনন করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে এটি খাঞ্জেলী দিঘি বা খানজাহান আলী দিঘি নামে পরিচিত।
গোড়াপত্তনের সময় খনন করা পুকুর ও দিঘিগুলোর মধ্যে এটিই সর্ববৃহৎ। দিঘি খননের পর পানির সুরক্ষায় তিনি এক জোড়া কুমির ছাড়েন। পুরুষ কুমিরের নাম রাখা হয় কালাপাহাড়, আর স্ত্রী কুমিরের নাম ধলা পাহাড়। পরবর্তী সময় বংশ পরম্পরায় তাদের পুরুষ ও স্ত্রী সন্তানদের এই নামেই ডাকা হতো।
যুগের পর যুগ টিকে থাকা খানজাহানের ছাড়া সেই আদি বংশধরের সর্বশেষ কুমিরটি প্রজনন না হওয়া, ঘুমের ওষুধ ও মাছ ধরার জালে আটকে আহত হওয়ার কারণে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মারা যায়।
দিঘিতে কুমিরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি কুমির এনে ছাড়া হয়েছিল। সেগুলোর অধিকাংশই মারা গেছে। সর্বশেষ যে দুটো টিকে ছিল, তার একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যায়। এর পর থেকে দিঘিতে একটি কুমিরই রয়েছে। খানজাহান আমলের কুমিরগুলোর মানুষকে আক্রমণের তেমন ইতিহাস ছিল না। তবে ভারত থেকে আনা এই কুমিরটি বারবার হিংস্র আচরণ করছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে এই কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিঘির প্রধান ঘাটে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ কুমিরের আক্রমণে গুরুতর আহত হন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকেও আক্রমণ করেছিল এটি। একের পর এক আক্রমণের ঘটনা ঘটলেও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেয়নি।
সরকারি পিসি কলেজের প্রাণী বিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শিরিনা আফরোজ বলেন, ‘কুমির মাংসাশী প্রাণী। আক্রমণ করে খাবার সংগ্রহ করতে সে পছন্দ করে। দিঘিতে মাছের প্রাচুর্য থাকলেও মাংসাশী প্রাণী হওয়ায় কুমিরটির খাদ্যসংকট রয়েছে। সে জন্ম ও বংশগতভাবেই হিংস্র। সুযোগ পেলে আক্রমণ করা তার স্বভাব। দীর্ঘদিন ধরে একা থাকায় তার মেজাজ বুনো রূপ নিয়েছে। আবদ্ধ জায়গায় কুমির লালন-পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানসম্পন্ন তত্ত্বাবধায়ক ও পরিচর্যাকারী থাকা প্রয়োজন। তাহলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।’
করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আযাদ কবির জানান, দিঘির দুই ঘাটে কুমিরটিকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হয়। খাবার পাওয়ার আশায় কুমিরটি বারবার ঘাটে চলে আসে। ফলে ঘাটে গোসল ও অজু করতে নামা দর্শনার্থীরা সহজে তার লক্ষ্যের মুখে পড়ছে।
আযাদ কবির বলেন, ‘এই আক্রমণ বন্ধ করতে হলে ঘাটগুলোকে খাঁচার বেড়ায় আটকে দিতে হবে। দিঘির চারপাশও ফেন্সিং করা প্রয়োজন, যাতে কুমিরটি বাইরে বের হতে না পারে। কুমির হিংস্র প্রাণী, সুযোগ পেলেই সে আক্রমণ করবে। দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রাথমিক অবস্থায় কুমিরটিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। পরবর্তী সময় খাঁচা বা অন্য কোনো সুবিধাজনক পরিবেশ নিশ্চিত করে আবারও কুমির রাখার বিষয়টি চিন্তা করা হবে। আপাতত মাজার এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। দর্শনার্থীরা যাতে দিঘির পানিতে যত্রতত্র না নামেন, কুমির থেকে সাবধানে থাকেন, সেজন্য সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানো হবে।’
জেলা প্রশাসন ও মাজার কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ময়নাতদন্ত ছাড়াই দুপুরে মাজারের পাশেই ফাতেমার জানাজা শেষে সংলগ্ন এলাকার গণকবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এর আগে, সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাজার সংলগ্ন দিঘির পূর্ব পাশে নারীদের ঘাটে গোসল করতে নামে শিশু ফাতেমা আক্তার। এ সময় একমাত্র কুমিরটি তাকে টেনে নিয়ে গেলে চারদিকে চিৎকার শুরু হয়। স্থানীয়রা দিঘিতে নৌকা নামিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।
পরবর্তী সময় ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও জেলা প্রশাসন এই অভিযানে অংশ নেয়। রাতভর তল্লাশি শেষে মঙ্গলবার ভোরে মহিলা ঘাটের পাশ থেকে ওই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেন খাদেম ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা।


