বাংলাদেশে গড়ে ওঠেছে মানুষের কঙ্কালের এক রহস্যময় বাজার। মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর সরবরাহ হয় কয়েক হাজার কঙ্কাল, তবে এর বেশিরভাগেরই আনুষ্ঠানিক উৎস অজানা।
মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর পরই ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার জন্য কঙ্কালের প্রয়োজন পড়ে। সাধারণত প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা সিনিয়রদের কাছ থেকে পুরনো কঙ্কাল কিনে নেন। আবার পুরনো সেটগুলো নষ্ট বা ক্ষয়ে গেলে নতুন করে কেনার দরকার হয়।
শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক শিক্ষার্থী তার এক সিনিয়রের কাছ থেকে ৪৫ হাজার টাকায় একটি কঙ্কাল কিনেছিলেন। চার বছর পড়ালেখা শেষে তিনি সেটি এক জুনিয়রের কাছে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। বাজারে সম্পূর্ণ আস্ত কঙ্কালের পাশাপাশি শরীরের একেকটি অংশের হাড়ও আলাদা আলাদা বিক্রি হয়।
বর্তমানে বিভিন্ন ‘বোনস ব্যাংক’ বা কঙ্কাল কেনাবেচার মাধ্যমে ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকায় একটি আস্ত কঙ্কাল কেনা যায়। তবে এই কঙ্কালগুলো ঠিক কোথা থেকে সংগৃহীত, সেই উৎস কোনো বিক্রেতাই প্রকাশ করতে রাজি হন না।
সরকারিভাবে বা আইনি উপায়ে কঙ্কাল পাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় মেডিকেল শিক্ষায় ব্যবহার হওয়া এসব কঙ্কালের আসল উৎস নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৭টি সরকারি ও ৭৩টি বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১১০টি মেডিকেল কলেজ এবং ৫টি সরকারি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীর প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের অ্যানাটমি ক্লাসের জন্য মানুষের কঙ্কাল লাগে। পাশাপাশি ডেন্টালের শিক্ষার্থীদের জন্য মাথার খুলি ও দাঁতের অংশের দরকার পড়ে।
শিক্ষার্থীরা কিভাবে এই কঙ্কালগুলো যোগাড় করেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফাহমিদা হক ও সোহেলী মুনজুরী তন্বী জানান, শিক্ষার্থীরা কেনাকাটাসহ নানা উপায়ে এগুলো জোগাড় করে। তবে তারা ঠিক কোথা থেকে বা কিভাবে এগুলো পায়, তা শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে।
বাস্তবতা হলো, দেশের বিভিন্ন কবরস্থান থেকে প্রায়ই কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটে। অনেক সময় হাতেনাতে চোর ধরাও পড়ে। এর বাইরে অনলাইনে ও সরাসরি খোলাবাজারেও কঙ্কাল কিনতে পাওয়া যায়।
‘আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম’-এর দাফন সেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মূলত রাজধানীর জুরাইন ও রায়েরবাজার বধ্যভূমি কবরস্থানে দুই হাজার ১৪টি পরিচয়হীন মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ মরদেহ গ্রহণ করি এবং কবরস্থানে পৌঁছে দিই। মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়ার পর বাকি দায়িত্ব কবরস্থান কর্তৃপক্ষের। আমরা আর সেখানে নজরদারি করি না।”
বছরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি, ২০২৫ সালে ৬৪৪টি এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৩১০টি পরিচয়হীন মরদেহ দাফন করা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের ইনচার্জ রামু চন্দ্র দাস জানান, ময়নাতদন্তের পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে পরিচয়হীন মরদেহগুলো সাধারণত তিন দিন পর্যন্ত মর্গে রাখা হয়।
গত ১৬ জুলাই তিনি জানান, সেদিন মর্গে মোট ১০টি পরিচয়হীন মরদেহ ছিল, যার মধ্যে ৫টিই এসেছিল শাহবাগ থানা এলাকা থেকে।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গ সহকারী শ্যামল লাল বলেন, মরদেহগুলো দুই থেকে সাত দিন রাখার পর দাফন করা হয়। শিক্ষার্থীরা কিভাবে কঙ্কাল সংগ্রহ করে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে জানান, শিক্ষার্থীরা এগুলো যেকোনো উপায়ে “ম্যানেজ” করে নেয়।
হাসপাতালটির ফরেনসিক বিভাগের প্রধান মাকসুদুর রহমান জানান, এখনকার শিক্ষার্থীরা কিভাবে কঙ্কাল পায় তা তার জানা নেই। তবে তিনি নিজে যখন ছাত্র ছিলেন, তখন একটি ‘বোনস ব্যাংক’ থেকেই কঙ্কাল সংগ্রহ করেছিলেন।
মর্গে দীর্ঘ দিন পড়ে থাকা পরিচয়হীন মরদেহগুলোতে বিভিন্ন কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে কঙ্কাল তৈরি করা হয় এবং পরবর্তীতে তা চড়া দামে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেলের কর্মী সিকান্দার, তার ভাই পিওন বাবুল এবং মর্গের রামুর বিরুদ্ধে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। তবে তারা সবাই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঢাকা ডেন্টাল কলেজের এক কর্মী জানান, ভারত সীমান্ত দিয়েও অবৈধভাবে কঙ্কাল পাচার হয়ে আসে। একটি ব্যবহূত আস্ত কঙ্কাল প্রায় ৩৫ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গের এক সহকারীও একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নদী থেকে ভেসে আসা কিংবা ট্রেন দুর্ঘটনায় উদ্ধার করা অনেক মরদেহেরই পরিচয় শনাক্ত করা যায় না। দাফনের আগে তাদের আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
‘বোনস ব্যাংক’-এর মাধ্যমে বিক্রি
ফেসবুকে ‘প্রিমিয়াম বোনস’, ‘বোনস বিডি বাই/সেল’, ‘বোনস বাজার অব বাংলাদেশ’ এবং ‘মেডিকেল বোনস বাই অ্যান্ড সেল’-এর মতো ৫০টিরও বেশি পেজ রয়েছে, যেখানে খোলামেলাভাবেই মানুষের কঙ্কাল ও হাড়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়।
সেখানে নতুন হাড়ের সেট ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকায় এবং পুরনো বা ব্যবহৃত সেট ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ডেন্টালের শিক্ষার্থীদের জন্য হাড়ের সেট ১৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা এবং শরীরের একক কোনো হাড় ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকায় বেচাকেনা হয়।
বেশিরভাগ বিক্রেতাই নিজেদের আসল নাম গোপন রেখে ছদ্মনামে ফেসবুক খুলে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করতে বলেন। বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউই হাড়ের যোগান বা উৎসের কথা বলতে রাজি হননি।
কবর থেকে চুরি
কবরস্থানে পুরনো কবর নতুন করে খোলার সময় সেখান থেকে বের হওয়া হাড়গোড়ও গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই কাজের পেছনে কবর খোঁড়ার লোক (গোরখোদক) এবং সুসংগঠিত কিছু চোর চক্রের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে আলাদা আলাদা হাড় সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল বানিয়ে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করে।
গত ১৬ জুলাই রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের টেকীবাড়ী চানপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থান থেকে এক রাতেই নয়টি কঙ্কাল চুরি হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রাত ১০টার দিকেও কবরস্থান ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু রাতের কোনো এক সময় বেশ কয়েকটি কবরের কঙ্কাল চুরি হয়ে যায়।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সিরাজগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন কবরস্থান থেকেও একইভাবে কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে।
এমনকি ২০২০ সালে দিনাজপুরের দুটি কবরস্থান থেকে ৪২টি এবং টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের একটি কবরস্থান থেকে ২২টি কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছিল।
রাজধানী ঢাকার আজিমপুর, জুরাইন, রায়েরবাজার ও মিরপুর কবরস্থান এলাকা ঘিরেও এমন চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তারা একেকটি কঙ্কাল ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করে।
তবে আজিমপুর কবরস্থানের ইমাম ও জ্যেষ্ঠ মোহরার মো. হাফিজুল ইসলাম বলেন, কঙ্কাল চুরির অভিযোগ তদন্ত করতে পুলিশ ও সিআইডি একাধিকবার আসলেও তারা চুরির কোনো প্রমাণ পায়নি।
একইভাবে জুরাইন ও রায়েরবাজার কবরস্থানের কর্মকর্তারাও তাদের কবরস্থান থেকে কঙ্কাল চুরির বিষয়টি অস্বীকার করেন।
কঙ্কাল চোর গ্রেপ্তার
চলতি বছরের মার্চ মাসে রাজধানীর তেজগাঁও ও উত্তরা থেকে ৪৭টি মানুষের মাথার খুলি ও বিপুল পরিমাণ হাড়গোড়সহ কঙ্কাল চোর চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, এই চক্রটির পেছনে প্রায় ৭০০ সদস্যের একটি বিশাল অনলাইন নেটওয়ার্ক জড়িত। তারা দীর্ঘদিন ধরে ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও গাজীপুরের বিভিন্ন কবরস্থান থেকে লাশ দাফনের ৫ থেকে ৭ মাস পর কঙ্কাল চুরি করত। এরপর সেগুলো কেমিক্যাল দিয়ে ধুয়েমুছে প্রক্রিয়াজাত করে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করে দিত।
এর আগেও ২০২১ সালের অক্টোবরে ঢাকার পল্লবীর কালশী কবরস্থান থেকে কঙ্কাল চুরির সময় হান্নান নামের এক ব্যক্তিকে তিনটি মাথার খুলিসহ হাতেনাতে ধরা হয়।
তারও আগে ২০২০ সালের নভেম্বরে ময়মনসিংহে একটি বড় পাচারকারী চক্রের মূলহোতাকে বিপুল পরিমাণ মানুষের মাথার খুলি ও কঙ্কালসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ।


