দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে এখন চলছে ক্ষমতার ত্রিমুখী লড়াই। একদিকে ব্যাংকটির ওপর জামায়াতে ইসলামীর পুরোনো প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা, অন্যদিকে সেটি ঠেকানোর সরকারি উদ্যোগ, আরেকদিকে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণে রাখা এস আলম গ্রুপের প্রত্যাবর্তনের মরিয়া চেষ্টা।
প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণ-সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এই লড়াই সর্বশেষ প্রকাশ্য রূপ নেয় সোমবার। এদিন নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ঢুকতে না দেওয়ার লক্ষ্যে ও তার পদত্যাগের দাবিতে দিনব্যাপী বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর রুকন পদমর্যাদার বেশ কয়েকজনকে দেখা গেছে। ‘সংগঠনের নির্দেশেই’ কর্মীদের নিয়ে জড়ো হয়েছেন এবং দিনব্যাপী থাকবেন বলে দুপুরে টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানিয়েছেন একাধিক আন্দোলনকারী।

এদিন পুলিশকে বেশ সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়। টিয়ার শেল ও জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের বেশ কয়েকবার ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বিক্ষোভের কারণে এদিন পূর্বনির্ধারতি পর্ষদ সভা স্থগিত হয়। খুরশীদ আলম প্রধান কার্যালয়ে আসতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে ভার্চুয়াল পর্ষদ সভা আয়োজন করেছিল ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে আন্দোলনকারীরা প্রধান কার্যালয়ে প্রবেশ করে চাপ প্রয়োগ করলে ভার্চুয়াল সভাও হয়নি।
এদিন ৪০-৫০ জন আন্দোলনকারীকে খুরশীদ আলমের বসুন্ধরার বাসভবনের সামনেও অবস্থান নিতে দেখা গেছে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে ঈদের ছুটির আগের শেষ কার্যদিবসে। ২৪ মে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকে পদত্যাগপত্র পাঠান। একই দিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পর্ষদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ওইদিন রাত ৯টার দিকে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
২৪ মে সকাল থেকেই ইসলামী ব্যাংকের সমানে দুটি পক্ষ অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছিল। একটি পক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগ চায়। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা ওমর ফারুক খানকে এমডি পদে ফেরানোর দাবি করে। আরেকটি পক্ষ ওমর ফারুক খানের পদত্যাগের দাবি তুলেছিল।
ওইদিন ছিল ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ সভা। ওই সভায় ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্রের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আন্দোলনের মুখে ও চেয়ারম্যান পদত্যাগের কারণে ওইদিনের পর্ষদ সভা স্থগিত হয়। সভাটির জন্য ঈদের ছুটির পরের প্রথম কার্যদিবস নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের মুখে আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে ডেপুটি গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি জিয়া পরিষদের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংসদীয় আসন ঢাকা-১৭-এর নির্বাচন পরিচালনা কমিটিরও সদস্য ছিলেন।
খুরশিদ আলমের নিয়োগ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় জামায়াতপন্থী গ্রাহক ফোরাম ও ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ। তাদের কাছে এই নিয়োগ ২০১৭ সালের দখল-ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সোমবার সকাল থেকে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলের দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগ, বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো এমডি ওমর ফারুক খানের পুনর্বহাল, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের পদত্যাগ, এস আলমের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে বিক্রি এবং ব্যাংকটি এস আলম দখলের আগের ব্যক্তিদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
এ সময় জামায়াতে ইসলামীর ধানমন্ডি শাখার একটি ওয়ার্ডের আমির নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে জানান, ”সংগঠনের নির্দেশেই আমরা সকাল ৯টা থেকে ইসলামী ব্যাংকের সামনে অবস্থান নিয়েছি। ঈদের পরপর হওয়ায় উপস্থিতি তুলনামূলক কম হয়ছে।”
এদিকে অনলাইনে পর্ষদ সভা হবে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলনকারীরা প্রধান কার্যালয়ে প্রবেশ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ফ্লোর, বোর্ডরুমের সামনে এবং ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কক্ষের আশপাশে অবস্থান নেন।
ইসলামী ব্যাংকের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গ্রাহকদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে অনলাইনেও পরিচালক পর্ষদের বৈঠকটি করা হয়নি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্তটি সঠিক। আর আন্দোলনের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ারভুক্ত নয়, এটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো দেখবে।’
আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘কোনো ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের হতে পারে না। কিন্তু আন্দোলনকারীদের কর্মকাণ্ডে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে ইসলামী ব্যাংককে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অংগসংস্থায় পরিণত করার চেষ্টা চলছে।’
এদিকে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতপন্থী গ্রাহক ফোরামের আন্দোলন শুধু খুরশীদ আলমকে ঠেকানোর কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নেই। এর পেছনে রয়েছে ইসলামী ব্যাংকের ওপর দীর্ঘদিনের প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন থেকেই ব্যাংকটির ভেতরে-বাইরে জামায়াতঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা, গ্রাহক ও সংগঠিত ব্যক্তিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ৬ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সুবিধাবঞ্চিত কর্মকর্তারা বিক্ষোভ করেন এবং এস আলম আমলে নিয়োগ পাওয়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রবেশে বাধা দেন।
ইসলামী ব্যাংক জামায়াতের ব্যাংক কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এক জনসভায় বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক জামায়াত দখল করেনি, এ ব্যাংক তার মায়ের কোলে ফিরে এসেছে।” অথচ ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সম্পর্ক নেই।’
এই দুই বক্তব্যের ফাঁকেই ব্যাংকটির প্রকৃত রাজনৈতিক অবস্থান বোঝা যায়। নথি বলছে, প্রতিষ্ঠাকালে ইসলামী ব্যাংকের ৭০ শতাংশ বিনিয়োগ ছিল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে। বাংলাদেশের অংশ ছিল ৩০ শতাংশ, যার মধ্যে ৫ শতাংশ ছিল সরকারের, ১০ শতাংশ শেয়ারবাজারের আইপিও থেকে এবং ১৫ শতাংশ দেশীয় বেসরকারি স্পন্সরদের হাতে। শুরুতে জামায়াতের কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তবে নব্বইয়ের দশক থেকে ব্যাংকটির পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জামায়াতঘনিষ্ঠ প্রভাব বাড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে রাজনৈতিক দলটির পুরো নিয়ন্ত্রণে যায়।

জামায়াতের এই প্রভাবের ওপর ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি বড় আঘাত আসে। প্রতিষ্ঠানটিকে জামায়াতমুক্ত করার কথা বলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ফিল্মি স্টাইলে ব্যাংকটি দখল করে নেয় এস আলম গ্রুপ। সে দিন ডিজিএফআই কর্মকর্তারা তৎকালীন চেয়ারম্যান, একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাসা থেকে তুলে এনে পদত্যাগে বাধ্য করেন।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটিতে এস আলমের আধিপত্য চলে। এ সময়ে পটিয়া উপজেলা থেকে ৭ হাজার ২২৪ জনকে প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ব্যাংকটির মোট ঋণের অন্তত অর্ধেক, প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা এস আলম গ্রুপ ঋণের নামে লুট করে বলে অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে আসে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। ১১ আগস্ট ২০২৪ সকাল থেকে বৈষম্যবিরোধী ব্যাংকার সমাজের ব্যানারে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। একই দিন এস আলমপন্থী সশস্ত্র ব্যক্তিদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে গুলি ছোড়া হয়। অন্তত চার কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হন। ওই দিনই ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
এ ঘটনার তিন দিন পর ১৪ আগস্ট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব এস এম রবিউল ইসলাম নয়নসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তবে মামলাটি এখন কার্যত হিমাগারে পড়ে আছে। মতিঝিল থানা সূত্রে জানা গেছে, নয়ন জামিনে রয়েছেন।
এস আলম গ্রুপ সরাসরি নিয়ন্ত্রণ হারালেও ব্যাংকটির ওপর তার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করে। ওই সময় ব্যাংকটির ৮২ শতাংশ শেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংক জব্দ করে রাখে। কিন্তু এস আলম আমলে নিয়োগ পাওয়া হাজার হাজার কর্মকর্তা, জব্দ শেয়ার, আদালতের রিট, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং চাকরিচ্যুত কর্মীদের আন্দোলন গ্রুপটির সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পথ খোলা রেখেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইসলামী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এই লড়াই নতুন মাত্রা পায়। এস আলমের সময়ে বিধিবর্হিভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কথা বলা হলে যারা অংশ নেয়নি এমন প্রায় ৫ হাজার কর্মকর্তাকে চাকুরিচ্যুত করা হয়।
এসব চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা, এস আলমের এলাকা চট্টগ্রমের পটিয়ার লোকজন এবং এস আলম আমলের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এখন ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ-সংঘাতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তারা কখনো চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে, কখনো বর্তমান পর্ষদ ভাঙার দাবিতে, আবার কখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অবস্থান নিয়ে চাপ তৈরি করেছে।


