সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে হাওর অঞ্চলে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্যোগের পর সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা এখনো কৃষকদের হাতে পৌঁছেনি। ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া কৃষকরা বর্তমানে চরম অভাব ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
কৃষকরা জানান, তারা কেবল সরকারি সহায়তার ঘোষণার কথাই শুনছেন। বাস্তবে এই সহায়তা কবে নাগাদ তাদের হাতে পৌঁছাবে সে বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। এমনকি স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও সহায়তা বিতরণের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারছেন না।
ইটনা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাভেদ পাঠান জানান, সহায়তা কবে বিতরণ করা হবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। কারণ, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ওপরমহল থেকে তারা কোনো নির্দেশনা পাননি।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওর এলাকায় অন্তত ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে যায়। এরপর সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তার ঘোষণা দেয়। তবে প্রস্তাবিত এই সহায়তার পরিমাণ নিয়েও কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত প্রতিটি পরিবারকে রেশন কার্ডের মাধ্যমে আগামী তিন মাস প্রতি মাসে ২০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষতির ধরন অনুযায়ী তিন ক্যাটাগরিতে আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এতে পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৭ হাজার ৫০০ টাকা, আংশিক ক্ষতিগ্রস্তদের ৫ হাজার এবং সামান্য ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ২ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সহায়তা নিয়ে এই অনিশ্চয়তা কৃষকদের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চাষাবাদের জন্য অনেক কৃষক চড়া সুদে ঋণ নিয়েছিলেন। এখন সেই দেনা পরিশোধের চাপে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সংসার চালাতে অনেকে নতুন করে আবারও ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার খায়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের কালিমপুর হাওরে ১০ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন কৃষক রতন মিয়া। বন্যায় তার সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি জানান, একবার ফসল হারালে তা কাটিয়ে উঠতে অন্তত ১০ বছর সময় লাগে। সারা বছরের খাবার এখন তাকে কিনে খেতে হবে। সরকারি সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
একই গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন জানান, সরকারি সহায়তার কথা তারা কেবল শুনেই যাচ্ছেন। কিন্তু এই সহায়তা কবে আসবে তা না বুঝতে পারায় তাদের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কেবল কিশোরগঞ্জেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামের কৃষক মহিদুল ইসলাম সরকারি সহায়তার এই পরিকল্পনাকে অপর্যাপ্ত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এক লাখ টাকায় জমি লিজ নিয়ে আরও দেড় লাখ টাকা খরচ করে চাষাবাদ করেছিলেন। সব ফসল হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব। তিনি জানান, প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা সহায়তা দিয়ে এই বিশাল ক্ষতি পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
মিঠামইন উপজেলার শান্তিপুর গ্রামের কৃষক মনির হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তালিকায় যাদের নাম উঠছে তারা হয়তো প্রভাবশালীদের কাছের লোক। তিনি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আশ্বাস বা যোগাযোগ পাননি।
কৃষকদের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইটনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কুমার হাওলাদার জানান, বর্তমানে তালিকা তৈরির কাজ চলছে। ইউনিয়ন পরিষদ ও কৃষি বিভাগ আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ করছে। পরে দুটি তালিকা সমন্বয় করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হবে।
মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম খান এবং অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ সরকারও সহায়তা বিতরণের সময় সম্পর্কে কোনো ধারণা দিতে পারেননি। একই অসংলগ্নতা দেখা গেছে অষ্টগ্রামের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মজনু মিয়ার বক্তব্যেও।
তবে কিশোরগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা আশ্বস্ত করে বলেন, চলতি মাসের মধ্যেই সহায়তা বিতরণ শুরু হবে। যদিও মাসের ঠিক কোন তারিখ থেকে এটি শুরু হবে তা তিনি স্পষ্ট করেননি। এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে, সুনামগঞ্জ জেলার চিত্র আরও ভয়াবহ। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে সেখানে ৩২ হাজার ১৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। তাহেরপুর উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা ফয়সাল আবেদীন বলেন, মাত্র তিন মাসের এই প্রণোদনা দিয়ে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া অসম্ভব।
শাল্লা উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা সন্দীপন তালুকদার সুজন আক্ষেপ করে বলেন, হাওর অঞ্চলে ফসলহানি এখন একটি নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর ফসল নষ্ট হলেও সমস্যা সমাধানে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৪ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে জেলা প্রশাসক সমর কুমার পাল জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি।


