মাদ্রাসায় ধর্ষণে শিশু গর্ভবতী: মবের হুমকিতে চিকিৎসক

মাদ্রাসায় ধর্ষণে শিশু গর্ভবতী: মবের হুমকিতে চিকিৎসক
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

নেত্রকোণায় একটি কওমি মাদ্রাসায় ১১ বছর বয়সী একটি শিশু ধর্ষণে গর্ভবর্তী হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি যে চিকিৎসক সামনে এনেছেন, তার ওপর মব করে হামলা, ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংবাদ মাধ্যমে কথা বলে এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সায়মা আক্তার নামে সেই স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ।

আলোচিত এই ঘটনায় মামলার পাঁচ দিনেও ধর্ষণ মামলার আসামি মাদ্রাসা পরিচালক আমান উল্লাহ সাগরকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তাকে কোনোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে না, বলছেন নেত্রকোণার মদন থানার ওসি।

চিকিৎসক সায়মার স্বামী টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, মেয়েটির দুর্দশা তুলে ধরার পর থেকে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি ও অজ্ঞাত নম্বর থেকে তাকে ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

সায়মার মোবাইল ফোনে কল করা হলে সেটি ধরে তার স্বামী আসিফ বলেন, ‘অনবরত সাইবার বুলিং ও হুমকির কারণে সায়মার মানসিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত খারাপ। তিনি আপাতত কারও সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।’

কারা হুমকি দিচ্ছেন, এই প্রশ্নে ‘শহীদী হুংকার’, ‘সাজিদ মাদানি’সহ বিভিন্ন ফেসবুক আইডি ও কয়েকটি মোবাইল ফোন নম্বরের কথা জানিয়েছেন তিনি।

শিশুটিকে ধর্ষণের ঘটনায় নেত্রকোণার মদন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে জানিয়ে আসিফ জানান, হুমকির বিষয়ে পুলিশ তাদেরকে আরেকটি জিডি করার পরামর্শ দিয়েছে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার ওসির সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে।

মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘চিকিৎসক সায়মার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি ময়মনসিংহ সদর ও নেত্রকোনায় প্র্যাকটিস করেন। হুমকির বিষয়ে তারা থানায় এসে জিডি করবেন। জিডি হওয়ার পর আমরা অগ্রিম যতটুকু আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা গ্রহণ করব এবং সাইবার বুলিংয়ের সঙ্গে যুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা করব।’

ফেসবুক আইডিগুলোতে যা আছে

সাজিদ মাদানী’নামের যে ফেসবুক আইডি থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তার বায়োতে সিলেটের জামিয়া তাওয়াক্‌কুলিয়া রেঙ্গা থেকে তাকমিল ফিল হাদিস মাস্টার্স করার তথ্য দেওয়া আছে। ‘শহীদী হুংকার’ নামের ফেসবুক পেজে কালো কাপড় পরিহিত এক ব্যক্তির হাতে বন্দুক সদৃশ বস্তুর ছবি আছে। ‘সাজিদ মাদানী’ নামে ফেসবুক পাতাতেও একই ছবি দেখা গেছে।

দুই আইডিতেই নানা পোস্টে ধর্মীয় উগ্রবাদী বক্তব্য দেওয়ার পর গ্রেপ্তার হওয়া আতাউর রহমান বিক্রমপুরীর মুক্তি দাবি করা হয়েছে।

দুটি আইডি থেকে ক্রমাগত উগ্রবাদী ও হিন্দুবিদ্বেষী পোস্ট করা হয়। এর মধ্যে ‘প্রিয় মুসলিম বোনেরা হিন্দু ডাক্তার থেকে সাবধান’ জাতীয় পোস্টও রয়েছে।

আরও পড়ুন

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের ‘রাজাকার’ বলা নিয়ে স্যাটায়ার এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পক্ষে সমর্থন জানিয়ে পোস্ট রয়েছে আইডিগুলোতে।  ‘নাইন ইলেভেনের মোবারক অভিযানে অংশগ্রহণকারী সকল বীরদের রহম করুক’ এমন পোস্ট দুটি আইডি থেকেই করা হয়েছে।

সায়মা আতঙ্কে

ক্রমাগত হুমকির পর চিকিৎসক সায়মা নিজেও ফেসবুক লাইভে এসে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, একজন মা ও চিকিৎসক হিসেবে তিনি কেবল একটি অসহায় এতিম শিশুর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।

তিনি বলেন, ‘জীবনের থ্রেট তো আছেই, আমাকে রেইপ করে মেরে ফেলা হবে, মব সৃষ্টি করা হবে, আমাকে যেখানেই পাবে রাস্তায় কুপিয়ে মেরে ফেলা হবে—এই জাতীয় থ্রেটগুলো আমি পাচ্ছি প্রত্যেকদিন।’

‘সারাদিন সারারাত আমার মোবাইলে অনবরত টেক্সট আসতে থাকে। যারা আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন তারা নিজেরাও খেয়াল করেছেন টেক্সটের নোটিফিকেশনে আমি আসলে অতিষ্ঠ হয়ে গেলাম,’ বলেন তিনি।

পুরো পরিস্থিতি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘তারা কাইন্ড অব আমাকে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করতে চাচ্ছেন। আমি একজন মুসলিমের সন্তান আমি শেষ পর্যন্ত মানসিকভাবে শক্ত থাকতে চাই কিন্তু আমাকে এভাবে হ্যারাস করতে থাকলে আসলে আমি কতদূর শক্ত থাকতে পারব আমি জানি না।’

এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন তিনি। বলেন, ‘আপনারা অন্তত আমাকে একটু সাহস দিন, একটু ভরসা দিন আমাকে একটু সাপোর্ট দিন। আমি শুধুমাত্র অন্যায়ের বিপক্ষে কথা বলতে চেয়েছি আর কোনো কিছু না।’

গত ১ মে সায়মা মেয়েটার দুর্গতির কথা জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর ৫ দিনে প্রায় ৮ মিলিয়ন মানুষ সেটি পড়েছিল। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে তার ফেসবুক পাতাটি উধাও হয়ে গেছে।

কী ঘটেছে

চিকিৎসক সায়মা ময়মনসিংহ নগর মাতৃসদনে কনসালস্টেন্ট হিসেবে কর্মরত। তিনি নেত্রকোণার মদন উপজেলার স্বদেশ ডায়াগনেস্টিক সেন্টারেও রোগী দেখেন। গত ৩০ এপ্রিল মেয়েটিকে নিয়ে তার কাছে আসেন মা।

শিশুটি তখন চিকিৎসককে বলে, ‘পেটটা ভারি লাগে আর কি যেন লড়ে।’তখন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা যায়, মেয়েটি ২৭ সপ্তাহের গর্ভবতী।

গত ১ মে সায়মা তার ফেসবুক পাতায় আল্ট্রাসাউন্ডের একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘উত্তম শিক্ষার জন্য সন্তানকে ভর্তি করেছিলেন মহিলা মাদ্রাসায়। কে জানত? মাদ্রাসার বড় হুজুরের শয়তানির শিকার হতে হবে বাচ্চাটিকে, যিনি অলরেডি বিবাহিত ও ৫ মাসের একটি ছেলে সন্তানের বাবা।’

মেয়েটির শারীরিক গঠন অত্যন্ত দুর্বল, উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি। রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ৮ দশমিক ২ হওয়ায় সে গুরুতর রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। অপুষ্টি ও কৃমিজনিত সমস্যাও রয়েছে। গর্ভস্থ শিশুর মাথার আকার মায়ের পেলভিসের তুলনায় বড় হওয়ায় স্বাভাবিক প্রসব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলেও জানান চিকিৎসক সায়মা।

টাইমসকে সায়মা জানান, গত নভেম্বরে মাদ্রাসা ছুটির পর বড় হুজুরের কথায় মেয়েটি তার কক্ষ ঝাড়ু দিতে যায়। মেয়েটি ঘরে ঢুকলে তাকে ধর্ষণ করা হয়। পরে বলা হয়, এ কথা কাউকে বললে মেরে ফেলা হবে, মাকেও মেরে ফেলবে। এরপর আরও ৪/৫ দিন ধর্ষণ করা হয়।

আসামিও ফেসবুক লাইভে

গত ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় মেয়েটির মা নেত্রকোণার মদন থানায় মামলার করার আগে থেকেই আসামি ও মাদ্রাসার শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর আত্মগোপনে আসেন।

চিকিৎসক সায়মার পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর গত রাতে তিনি ফেসবুক লাইভে আসেন। তিনি দাবি করেন, মেয়েটির গর্ভবতী হয়ে যাওয়ার পেছনে তার কোনো ভূমিকা নেই, এবং তিনি ডিএনএ পরীক্ষা করাতেও রাজি আছেন।

সাগরের দাবি করেছেন, মাদ্রাসার নিয়মকানুন ও ‘হিজাব’ পরার বিষয়ে শিশুটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তাকে তার অভিভাবকদের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।

মদন থানার ওসি তরিকুল ইসলাম টাইমসকে জানিয়েছেন, তারাও সাগরের এই ভিডিও দেখেছেন। সেটি তদন্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানেও হয়েছে।

আসামিকে কেন গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা তো চেষ্টা করছি, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর